দেশে থ্যালাসমিয়ার চিকিৎসায় প্রথমবার হ্যাপলো ট্রান্সপ্লান্ট

থ্যালাসেমিয়া এক নীরব ঘাতকের নাম। জিনগত এই রোগের বিস্তার ঘটে থাকে বাবা-মা এর কাছ থেকে সন্তানের কাছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৮০ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। তবে এই রোগের জীনবহন করে চলেছেন আরো অনেকেই যাদের হয়তো রোগটির উপসর্গ নেই কিন্তু বংশবিস্তারের মাধ্যমে তার পরবর্তী প্রজন্ম থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। 

থ্যালাসেমিয়া মূলত রক্তের রোগ। রক্তের অক্সিজেন বহনকারী উপাদান হিমোগ্লোবিন বা লোহিত রক্ত কণিকা ত্রুটিপূর্ণ হয় তখন থ্যালাসেমিয়ার উপসর্গগুলো দেখা যায়। মূলত থ্যালাসেমিয়া দুই ধরণের হয়ে থাকে, আলফা থ্যালাসেমিয়া আর বিটা থ্যালাসেমিয়া। আলফা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে বাহকের তেমন কোন উপসর্গ থাকে না তাই জীবন-যাপন হয় স্বাভাবিক  তবে মূল সমস্যাটা বিটা থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে। বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনরে আক্রান্তরা কেবল সেই ত্রুটিপূর্ণ জীনের বাহকমাত্র। কিন্তু বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্তরাই মূলত রোগী।  মা আর বাবা দুইজনই যদি বাহক হন সেক্ষেত্রে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আর ২৫ শতাংশ এবং থ্যালাসেমিয়া মাইনরে আক্রান্ত হওয়া বা বাহক হবার আশঙ্কা শতকরা ৫০ ভাগ।

থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণে রক্ত স্বল্পতা, অবসাদ, স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া এবং যকৃত বড় হয়ে যাওয়ার মত উপসর্গ দেখা দেয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসা শুধুমাত্র নতুন রক্ত নেয়া কিংবা নতুন সুস্থ বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন। কিন্তু বার বার রক্ত নেয়ার যেমন ব্যায়সাপেক্ষ তেমনি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রক্তের আয়রণ জমে কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়ার ঝুঁকি থাকে। যেহেতু মা বা বাবার কাছ থেকেই এই রোগ সন্তানের কাছে আসে ফলে নিকটাত্নীয়দের মধ্যে ম্যাচিং বোনম্যারো পাওয়াটা প্রায় দুঃসাধ্য। তাই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প একেবারেই বিরল। তাদের আয়ুষ্কালও স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে অনেক কম হয়ে থাকে।

 কিন্তু এবার থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা পদ্ধতিতে আশার আলো দেখাচ্ছে ‘হ্যাপলো ট্রান্সপ্লান্ট’। এই পদ্ধতিতে ফুল ম্যাচিং অস্থিমজ্জা বা বোনম্যারোর পরিবর্তে অর্ধেক-অর্ধেক ম্যাচ হওয়া দুইজনের অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করা হয় রোগীর শরীরে।  এক্ষেত্রে বাবা-মা বা ভাই-বোন যেকেউ ডোনার হতে পারে।  ফলে ডোনার পাওয়া সহজ হয় অনেকটা। বাংলাদেশে প্রথমবারের মত এই চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যাবহার করে সফলতার দেখা পেয়েছে এভারকেয়ার হাসপাতাল।  তবে এই ট্রান্সপ্লান্টের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে রোগী বয়স দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে।  বাংলাদেশেও ২১ মাস বয়সী এক থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় ‘হ্যাপলো ট্রান্সপ্লান্ট’ সম্পন্ন করেছে হাসপাতালটি। সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান হাসপাতালটির চিকিৎসকেরা। 

এভারকেয়ার হাসপাতালের হেমাটোলজি এবং স্টেমসেল ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা: আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ জানান, “থ্যালাসেমিয়া রোগের একমাত্র কিউরেটিভ চিকিৎসা বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট কিন্ত ফুল ম্যাচড ডোনার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে মাত্র ১০ শতাংশ। তাই হ্যাপলো ট্রান্সপ্লান্ট বাংলাদেশে এক যুগান্তকারী অধ্যায় রচনা করতে যাচ্ছে।’’

বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট কিংবা হ্যাপলো ট্রান্সপ্লান্ট দুইটি প্রক্রিয়াই অত্যান্ত ব্যায়বহুল। তাই থ্যালাসেমিয়ার বিস্তার কমাতে সচেতনতাকেই প্রাধান্য দেয়া হয় বিশ্বব্যাপী। বিশেষ করে কোন দম্পতি সন্তান নেবার আগে কেউ থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা তা পরীক্ষার মাধ্যমে জেনে নেয়ার আহ্বান চিকিৎসকদের।


একাত্তর/এআর