করোনার পরবর্তীতে আবারও কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলতে বাধ্য করছে মাঙ্কিপক্স। এখন পর্যন্ত চারটি মহাদেশে এই মাঙ্কিপক্সের রোগী শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ইউরোপ আর আমেরিকায়। অথচ মাঙ্কিপক্সের উৎপত্তিটা এসব দেশে নয়। চলুন জেনে নেয়া যাক মাঙ্কিপক্সের আদ্যোপান্ত।
মাঙ্কিপক্স কী?
পক্স বা বসন্ত রোগের সাথে এশিয়া অঞ্চলের পরিচিত হলেও এতোদিন কেবল গুটি বসন্ত আর জল বসন্তের নামই শোনা গেছে বেশি। গুটি বসন্ত বা স্মল পক্সের প্রাদুর্ভাব এখন নেই বলেই চলে। আবার শিশুদের টিকা কার্যক্রম জোরদার হবার পর থেকে চিকেন পক্স বা জল বসন্তের প্রাদুর্ভাব থাকলেও তা খুব বেশী হুমকির কারণ হয়ে দাড়াতে পারেনি।
টিকার কারণে বর্তমানে কারো জল বসন্ত হলেও দশ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই তা সেরে যায়। তবে এবার ভাবিয়ে তুলছে মাঙ্কিপক্স। অন্যান্য পক্সের মতই জ্বর-ব্যথা আর সারা গায়ে ফুসকুড়ি হয়ে ঘাঁ হয়ে যায় এক্ষেত্রেও। অন্যান্য পক্সের মত এই পক্সও সংক্রামক।
মাঙ্কিপক্সের উৎপত্তি
মাঙ্কিপক্সের নাম শুনে মনে হতেই পারে এই রোগ হয়তো বানরের সাথে কোনভাবে সম্পর্কিত। রোগটি বন্যপ্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায় ঠিকই কিন্তু এই রোগটির সাথে বানরের কোন সম্পর্ক নেই। এই রোগের জীবাণুবহন করে মূলত ইঁদুর আর কাঠবিড়ালীর মত প্রাণী।
১৯৫৮ সালে গবেষণার জন্য রাখা পশ্চিম আর মধ্য আফ্রিকার রেইনফরেস্ট এলাকার কিছু বানরদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছিলো বলেই রোগটির নাম মাঙ্কিপক্স।
এরপর ১৯৭০ সালে প্রথম ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক কঙ্গোতে প্রথমবারের মত মানুষের শরীরে এই রোগের সংক্রমণ ঘটে। এরপর আরও বেশ কয়েকবার এই মাঙ্কিপক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, বিশেষ করে আফ্রিকান দেশগুলোতে। ২০২২ এর আগে ২০০৩ সালেও একবার মাঙ্কিপক্সের প্রকোপ ছড়িয়েছিলো আফ্রিকার বাইরের দেশগুলোতে।
মাঙ্কিপক্ষের ধরণ
এখন পর্যন্ত মাঙ্কিপক্সের দু’টি ধরণ আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। একটি মধ্য আফ্রিকার প্রজাতি আর অন্যটি কঙ্গো প্রজাতি। মধ্য আফ্রিকার প্রজাতির চেয়ে কঙ্গো প্রজাতি অনেক বেশী ক্ষতিকর আর সংক্রামক বলেই জানা যায়।
গবেষকরেরা বলছেন, কঙ্গো প্রজাতির মাঙ্কিপক্সে মৃত্যুহার দশ শতাংশ আর মধ্য আফ্রিকার প্রজাতির সংক্রমণে মৃত্যুহার এক শতাংশ। এখন পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়া মাঙ্কিপক্স সংক্রমণটি মূলত মধ্য আফ্রিকান প্রজাতির বলেই মনে করা হচ্ছে।
মাঙ্কিপক্সের জীবাণুটি ডিএনএঘটিত বলে এটি করোনার ভাইরাসের মত খুব সহজে মিউটেশন বা পরিবর্তিত হতে পারে না। তাই হঠাৎ করে নতুন কোন প্রজাতির কারণে প্রাদুর্ভাব ঘটেছে কি না তা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন অণুজীব বিজ্ঞানীরা।
মাঙ্কিপক্স কিভাবে ছড়ায়
এখন পর্যন্ত চারটি মহাদেশের বেশ কিছু দেশে মাঙ্কিপক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। সাধারণত প্রাণী থেকে মানুষে এবং মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে থাকে এই রোগ।
কোনভাবে আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে আসলে কিংবা আক্রান্ত প্রাণীর আঁচড় বা কামড়ের মাধ্যমে এই রোগ মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে।
শরীরে থাকা যে কোন তরল পদার্থ যেমন মিউকাস লালা এই জীবাণু বহন করতে পারে। এছাড়া নিঃশ্বাসের মাধ্যমেও এই রোগের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
আক্রান্ত ব্যাক্তির কাছে বেশিক্ষণ থাকলে কিংবা তার বিছানা-পত্র ব্যবহার করলে মাঙ্কিপক্স সংক্রমিত হতে পারে।
আক্রান্ত ব্যক্তির লালা বা রাসপেরিটরি ড্রপলেট থেকেও এ রোগ ছড়ায়। সুস্থ ব্যাক্তির চোখ, নাক বা মুখের মাধ্যমে কিংবা কোন কাঁটা-ছেঁড়া থাকলে তার মাধ্যমেও জীবাণু তার শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
মাঙ্কিপক্সের উপসর্গ
মাঙ্কিপক্সের উপসর্গ অনেকটা গুটি বসন্ত বা স্মল পক্সের মতই।
- জ্বর
- মাথাব্যথা
- পিঠব্যাথা
- শরীর গিঁট আর পেশীব্যাথা
- ক্লান্তি
- জ্বর আসার এক থেকে তিন দিনের মধ্যে গায়ে ফুসকুঁড়ি ওঠা এবং ধীরে ধীরে ঘাঁ হওয়া
মাঙ্কিপক্সের চিকিৎসা
মাঙ্কিপক্স সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে গা ব্যাথা কিংবা ফুসকুঁড়ি যন্ত্রণাটাই অস্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠে এই সময়টাতে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে একটু বেশী সতর্ক থাকার কথা বলা হচ্ছে।
বসন্তের জন্য প্রচলিত এন্টিভাইরাল ওষুধগুলোই ব্যবহার করা হচ্ছে মাঙ্কিপক্সের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে বর্তমানে। তবে প্রতিকারে আগে প্রতিরোধের জন্য প্রচলিত যে টিকা রয়েছে সেটি বেশ কার্যকর বলে দাবি করছেন গবেষকেরা। টিকা দেয়া থাকলেও যদি কেউ মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত হয় সেক্ষেত্র সংক্রমণের মাত্রা হবে অনেকটাই সহনীয়।
আতঙ্কিত হবেন কি!
যদি প্রচলিত টিকা আর ওষুধ দিয়ে সারিয়ে তোলা যায় মাঙ্কিপক্সের রোগীকে তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে কেন এত সতকর্তা। মূলত, করোনা পরবর্তী বাস্তবতাই মাঙ্কিপক্সের প্রাদুর্ভাব নিয়ে ভাবিয়ে তুলছে স্বাস্থ্য মোড়লদের। করোনার সংক্রমণের ক্ষমতা আর ভয়ঙ্কর পরিণতির কারণে পুরো পৃথিবী প্রায় স্থবির হয়েছিল প্রায় দুই বছর।
পৃথিবী আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, দেশে-দেশে যোগাযোগও বেড়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ। তাই এই রোগটি যেনো করোনার মত সবখানে ছড়িয়ে যেতে না পারে সেটাই এমন আগাম সতকর্তার প্রথম কারণ। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, মাঙ্কিপক্সের এত রোগী এর আগে কখনো এক সাথে পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শতাধিক রোগীর হিসেব মিললেও প্রকৃত সংখ্যাটা আরও বেশী হবার কথা বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগে আফ্রিকার বাইরে দুই একজন রোগি পাওয়া গেলেও তাদের আফ্রিকা ভ্রমণের ইতিহাস ছিলো কিংবা সেট খুব বেশী ছড়াতে পারেনি।
কিন্তু এবার সংক্রমণ যাদের মধ্যে ছড়িয়েছে তাদের বেশীর ভাগই ইউরোপ-আমেরিকার বাসিন্দা যাদের অনেকেরই সাম্প্রতিক সময়ে আফ্রিকা ভ্রমণের ইতিহাস নেই। তৃতীয় কারণটা হলো সংক্রমণের চেইন ভাঙতে না পারা।
এর আগে যতবারই মাঙ্কিপক্সের প্রকোপ দেখা গেছে সেটি বণ্যপ্রাণী থেকে মানুষের দেহে আসার পর জীবাণুটি খুব বেশী মানুষের মধ্যে ছাড়াতে পারেনি কারণ মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত ব্যাক্তির কাছে অনেকক্ষণ অবস্থান করলে রোগটি ছাড়ানোর আশঙ্কা থাকে কিন্তু অল্প সময়েই করোনার মত ছড়িয়ে পরার কথা নয় মাঙ্কিপক্স।
তবে এবারের রোগটির সংক্রমণ ধরণটা অন্যরকম হওয়া মাঙ্কিপক্সের জীবাণুর মধ্যে কোন পরিবর্তন বা মিউটেশন হয়েছে কি না তা ভাবিয়ে তুলেছে গবেষকদের।
তবে আগের মতই আতঙ্কিত নয় বরং সচেতন হবার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা। করোনার সময় গড়ে ওঠা মাস্কের ব্যবহারে অভ্যাস কাজে লাগতে পারে মাঙ্কিপক্সের সংক্রমণ রোধেও। বিশেষ কর পক্স জাতীয় রোগ হলে ঘরে বসে না থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবার কথাই বলছেন তারা।
একাত্তর/এআর