মশা: উড়ন্ত এক আতঙ্কের নাম

মশা! দুই শব্দের এই পতঙ্গ এখন মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। বিশেষ করে রাজধানীবাসীর কাছে মশা শুধু একটি আতঙ্কের নামই নয়, রীতিমতো মাথা ব্যথা ও বিপদেরও বড় কারণ। এই মশার মাধ্যমে মানবদেহে ছড়ায় বহু ধরনের জীবাণু, যা অনেক সময়ই হুমকি হয়ে ওঠে।

মশা কামড়ে নানা ধরনের রোগ ছড়ায়। এর মধ্যে আছে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, পীতজ্বর ইত্যাদি। এসব রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়। বলা হয়, বিশ্বের প্রতিবছর মৃত্যুর দশ শতাংশের জন্য দায়ী মশা নামের ক্ষুদ্র পতঙ্গটি।

আমরা মুখে বলি মশা কামড়ায়। আসলে সেটি ভুল। মশা কামড়াতে পারে না। কারণ মশার কোন দাঁত নেই। এই পতঙ্গের রয়েছে শুঁড়। এরা শুঁড় দিয়ে আমাদের শরীর থেকে রক্ত চুষে নেয়। শুধু মানুষই নয়, অন্যান্য প্রাণী থেকেও রক্ত চুষে নেয়। রক্তই এদের প্রধান খাদ্য।

মশার কামড়ে বিরক্ত হননি এমন মানুষ বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এটি একধরনের ছোট মাছি প্রজাতির পতঙ্গ। ‘প্রজাতি’ কথাটা হয়তো পুরোপুরি ঠিক নয়। বৈজ্ঞানিকভাবে বললে, একই বর্গের কীট। বর্গের নাম, ডিপটেরা। এটি মূলত মাছির বর্গ।

অধিকাংশ প্রজাতির স্ত্রী-মশা স্তন্যপায়ী প্রাণীর রক্ত পান করে। মেরুদণ্ডী প্রাণীর, যেমন স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী, এমনকি কিছু মাছের শরীর থেকেও রক্ত শোষণ করে মশা। এ রকম হাজারো প্রজাতির মশা রয়েছে।

আরও পড়ুন: ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

অ্যানোফিলিস, কিউলেকস, এডিস, হেমাগোগাস প্রভৃতি রোগ সংক্রমণের চলক হিসেবে কাজ করা মশাদের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সাধারণভাবেও এগুলোই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এসব প্রজাতির মশাদের নিয়েই লোকালয়ে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক।

পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রজাতির মশা পাওয়া গেছে। যেসব মশা নিয়মিত মানুষকে কামড়ায়, তারা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের শরীরে রোগজীবাণু সংক্রমণের চলক হিসেবে কাজ করে।  কিছু কিছু প্রজাতির মশা মানুষকে কামড়ায় না।

মানুষকে না কামড়ালেও অন্যান্য প্রাণীদের শরীরে রোগ সংক্রমণের চলক, তারা মূলত বিভিন্ন কারণে, যেমন হঠাৎ বন ধ্বংস বা বাসস্থান থেকে উৎখাত করা হলে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। যদিও এগুলো যেসব প্রাণীর শরীর থেকে রক্ত শুষে নেয়, তা তাদের শরীরের তুলনায় খুবই অল্প।

শুধু নারী মশা রক্ত পান করে। পুরুষ মশার রক্ত চোষার মতো হুল নেই। ওরা কচি পাতার রস ও ফুলের মধু পান করে বাঁচে। মশা তার শরীরের ওজনের তিন গুণ বেশি রক্ত পান করতে পারে। এই পরিমাণ রক্ত নিয়ে উড়তে তাদের কোনো সমস্যা হয় না।


একটি মশা ঘণ্টায় প্রায় ১-১.৫ মাইল বেগে উড়ে যেতে সক্ষম। মশা সেকেন্ডে প্রায় ৩০০-৬০০ বার ডানা ঝাপটাতে পারে। অতি অল্প সময়ে এতবার ডানা ঝাপটানোর কারণেই আমরা গুনগুন শব্দ শুনতে পাই। যা মানুষের মধ্যে বিরক্তি থেকে যন্ত্রণাও তৈরি করে থাকে।

ধারণা করা হয়, মশা ২৫০০ বছর আগে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে। পুরুষ মশা শুধু এক দিন বাঁচে। নারী মশা সচরাচর ৬-৮ সপ্তাহ বেঁচে থাকে। একটি মশা একবারে ৩০০টির বেশি ডিম দেয়। এ পৃথিবীতে শুধু অ্যান্টারটিকা মহাদেশে মশা নেই। আর সবখানেই মশা আছে।

মশার জীবনচক্র চারটি পর্যায়ে বিভক্ত- ডিম, শূক, মুককীট ও পূর্ণাঙ্গ মশা। বেশিরভাগ প্রজাতির পূর্ণাঙ্গ নারী মশা বদ্ধ পানি বা জলাশয়ে ডিম পাড়ে। কিছু পানির কাছাকাছি, বাকিরা জলজ গাছে ডিম পাড়ে। মশা ডিম পাড়ার জন্য পানিতে বা পানির কাছাকাছি অবস্থান নির্বাচন করে।

কিছু কিছু মশা হ্রদে, কিছু সাময়িক ডোবায়, কিছু জলাভূমিতে, আবার কিছু লবণাক্ত জলাভূমিতে ডিম ছাড়ে। লবণাক্ত পানিতে ডিম পাড়া মশাদের মধ্যে সমান সংখ্যক প্রজাতি বাড়িতে পরিষ্কার পানিতে ও লবণাক্ত পানিতে ডিম পাড়ে। মশা সমুদ্রের পানির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে।

ডিম


প্রজাতি অনুযায়ী মশার ডিম পাড়ার ধরনে পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি, নারী মশা পানির ওপরে ওপর-নিচ বরাবর ওড়াউড়ি করে এবং পানিতে ডিম ছাড়ে। অ্যানোফিলিস প্রজাতি এমনটা বেশি করে থাকে। ডিমের দুপাশে পানিতে ভেসে থাকার উপাদান রয়েছে।

কিছু প্রজাতির পূর্ণাঙ্গ নারী মশা তার জীবনচক্রে ১০০ থেকে ২০০টি ডিম দিতে পারে। ডিম পাড়ার আগে নারী মশাদের প্রচুর পুষ্টি প্রয়োজন হয়। রক্ত খেয়ে মশা সেই পুষ্টির যোগান দেয়। তাই অন্যান্য প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর হলেও রক্ত শোষণ মশার জীবনচক্রেরই অংশ।

শূক


মশার শূক বা লাভায় খাবার উপযোগী মুখসহ সুগঠিত মাথা, পা-হীন বক্ষস্থল, ও বিভক্ত পেট থাকে। লাভা চারটি স্তরে বৃদ্ধি পেয়ে মুককীটে পরিণত হয়।

মুককীট


মশার মুককীট দেখতে কমা-আকৃতির। মাথা ও বক্ষস্থল পেটের সঙ্গে বাঁকা হয়ে একত্রিত হয়। মুককীট তার পেটের সাহায্যে সাঁতার কাটতে পারে। বেশির ভাগ প্রজাতির মুককীটকে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য প্রায়ই পানির ওপরে আসতে হয়।

পূর্ণাঙ্গ মশা


প্রজাতি অনুযায়ী ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে সময়ের পার্থক্য দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রার ব্যাপক প্রভাব থাকে। কিছু প্রজাতির ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে সময় লাগে পাঁচ দিনের মতো। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে সময় লাগে ৪০ দিন বা কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে আরও বেশি। পূর্ণাঙ্গ মশার শারীরিক আকৃতি শূকের ঘনত্ব ও পানিতে খাদ্যের পর্যাপ্ততার ওপর নির্ভর করে।


একাত্তর/আরএ