বিস্মৃত হওয়ার অধিকার চেয়ে আদালতে ভারতীয় অভিনেতার আবেদন

নিজের 'বিস্মৃত হওয়ার অধিকার' চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন ভারতীয় অভিনয়শিল্পী ও রিয়ালিটি শো সেলিব্রিটি আশুতোষ কৌশিক। বৃহস্পতিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দিল্লীর হাইকোর্টে তিনি এই আবেদন পেশ করেন।

প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় আগে করা একটি ঘটনার মধ্যে আজ পর্যন্ত তার জীবন আটকে রয়েছে উল্লেখ করে এর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য 'বিস্মৃত হওয়ার অধিকার' চেয়ে আবেদন করেন তিনি। খবর বিবিসির।

বিশেষজ্ঞদের মতে, 'বিস্মৃত হওয়ার অধিকার' বলতে বোঝায় নিজের ব্যক্তিগত যেসকল তথ্য সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত তা ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে নেয়ার অধিকার। এ ধরনের আইন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর কাছে সুপরিচিত হলেও ভারতের জন্য এটা খুবই নতুন একটি ধারণা এবং আইনেও এমন কোনো বিষয়ের উল্লেখ নেই।

২০০৭ সালে জনপ্রিয় ভারতীয় রিয়ালিটি শো 'এমটিভি রোডিস' এবং পরবর্তী বছর 'বিগ বস'-এ জয়ী হয়ে খবরের শিরোনামে চলে আসেন আশুতোষ কৌশিক। এর মাধ্যমে দর্শকদের প্রশংসা এবং ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। কিন্তু মাত্র এক বছর পর মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোয় জরিমানা হলে নিন্দার ঝড়ে তার জনপ্রিয়তা ভেসে যায়।


এসময় একদিন আদালতে অবস্থান ও আড়াই হাজার রুপি জরিমানাসহ এক বছরের জন্য তার ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত করা হয়।

অর্থের হিসেবে মাত্র আড়াই হাজার রুপি জরিমানা হলেও, এর জন্য তাকে যে ভোগান্তি সহ্য করতে হয়েছে তা আজও তাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে বলে আবেদনে উল্লেখ করেছেন তিনি।

শুধু সেলিব্রিটি বলেই এই ঘটনা তখন ফলাও করে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ছাপা হয়। এখনও পর্যন্ত ইন্টারনেটে তাকে খোঁজা হলে সে সময়কার ছবি, ভিডিও এবং অন্যান্য প্রতিবেদন পাওয়া যায়। কৌশিকের দাবি, এর জন্য তাকে পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবনে অনেক বড় মাশুল গুনতে হয়েছে।

ফোনে যোগাযোগ করা হলে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে তিনি বলেন, তখন আমার বয়স মাত্র ২৭ ছিল। এত কম বয়সে যা দরকার তারচেয়ে অনেক বেশি আমি পেয়েছি। আমার বাবা ছিলেন না। আমি অনভিজ্ঞ থাকায় ভুল করেছি আর তার শাস্তিও পেয়েছি। কিন্তু আমার বয়স এখন ৪২, আর এখনও সেই কাজের জন্য ভুগছি।


সেই ঘটনার পর তাকে সবাই ত্যাগ করে বলে জানান তিনি। বো এখন যখনই কেউ আমার দিকে তাকায় সেখানে নেতিবাচকতা থাকে। আমি কাজ হারিয়েছি, বিয়ে করতে গিয়ে অসংখ্যবার না শুনেছি, আর যখনই কোনো নতুন বাড়িতে যাই আমার প্রতিবেশিরা আমার দিকে উদ্ভটভাবে তাকায়।

কৌশিকের ব্যাংকার স্ত্রী অর্পিতা জানান, ওই ভিডিওগুলোর কারণে আমার পরিবার ওর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। আমার আত্মীয়রা ওর অতীত নিয়ে চিন্তিত ছিল আর আমার ভাইতো আজ অব্দি তাকে মেনেই নেয়নি, আমার সঙ্গে কথাও বলেন না। আমার মতে, ভুল যে কেউ করতে পারে। কিন্তু তাই বলে তাকে সারাজীবন কেন সাজা পেতে হবে?

কৌশিক বলেন, যেকোনো শাস্তির একটি মেয়াদ থাকলে, ডিজিটাল ক্ষেত্রেও এর নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকা উচিৎ। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং চ্যানেলের সঙ্গে আলোচনা করে এগুলো সরানোর চেষ্টা করেছেন বলে জানান তিনি। এমনকি ভারতের তথ্য এবং প্রচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন।


এই পুরো ঘটনা তাকে অসহনীয় যন্ত্রণা দিয়েছে উল্লেখ করে ভারতীয় সরকার, গণমাধ্যম, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এবং গুগলের মাধ্যমে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে ওই কন্টেন্ট সরিয়ে নেওয়ার আবেদন করেন।

শুধু কৌশিকই না, তার মতো অন্তত ডজন খানেক ব্যক্তি একইরকম আবেদন আদালতে পেশ করে রেখেছেন।

এ বিষয়ে ভারতীয় সরকার বলছে, নতুন হতে যাওয়া ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপত্তা আইনে এই ধারার উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া গুগলের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমাদের সার্চে যা কিছু অনলাইনে পাওয়া যায় তাই দেখায়। এক্ষেত্রে কেউ এ ধরনের আবেদন করলে আমরা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে শুরু করার পরামর্শ দেই।

কিন্তু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কে রয়ের মতে, ভারতীয় নাগরিকদের বিস্মৃত হওয়ার অধিকার চর্চা খুব সহজ নয়। হাজারটা ব্লগ নিয়ে ইন্টারনেটের পরিসর এত বেশি বড় এবং এখানকার নাগরিকরা এত বেশি সংবেদনশীল যে যেকোনো কন্টেন্ট সরিয়ে নেয়া যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।


এর আগে, বিস্মৃত হওয়ার অধিকারকে গোপনীয়তার অধিকারের জরুরি অংশ হিসেবে উল্লেখ করে উড়িষ্যা এবং কর্ণাটকের হাইকোর্ট এর স্বীকৃতি দেন। ২০১৮সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট গোপনীয়তার অধিকারকে মৌলিক অধিকার বলে আখ্যায়িত করেন।

কৌশিকের আইনজীবী অক্ষত বাজপেয়ী বলেন, ৫০ বছর পর কৌশিকের নাতিরা যখন তাকে ইন্টারনেটে খুঁজবেন তারা তার জয়ের খবরের সঙ্গে দুর্ঘটনার খবরও পাবে। তার যা সাজা পাওনা ছিল তা তিনি পেয়ে গেছেন, এখন তার গোপনীয়তার অধিকার আছে। একইসঙ্গে এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখার জন্য সমাজ এবং আদালতকে আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, বিস্মৃত হওয়ার অধিকারের সঙ্গে জানার অধিকার সাংঘর্ষিক। কিন্তু আমি আশা করবো এক্ষেত্রে আদালত মধ্যবর্তী কোনো পথ খুঁজে বের করবে। খুন, ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজগুলো সমাজের জানার যেমন অধিকার আছে, তেমনি লঘু অপরাধের জন্য আদালত বিস্মৃত হওয়ার অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে।


একাত্তর/টিএ