তুরস্কে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ঝুঁকি নিয়ে ফিরছে মানুষ

গেলো ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ৪৭ হাজার ছাড়িয়েছে। ওই ভূমিকম্পের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই সোমবার (২০ ফেব্রুয়ারি) তুরস্ক-সিরিয়া অঞ্চলে আবারও শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৪। নতুন করে আরও আট জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। 

ভূমিকম্পে পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে তুরস্কের ১০টি অঞ্চল। দেশজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক লাখ ভবন। বিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। চিকিৎসা সংকটের পাশপাশি খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে লাখ লাখ তুরস্কবাসীকে। বাড়ছে শীতের প্রকোপ। ফলে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাখ লাখ মানুষ রাত কাটাচ্ছে এসব ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে।  

৪৯ বছর বয়সী জেইনেপ কোকা, দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের আদানায় একটি ধসে পড়া ভবনের কাছে তার দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁবুতে থাকছেন। 

তিনি বলেন, নতুন জীবন গড়ার জন্য আমাদের সবকিছুর প্রয়োজন। আমার কিছু অবশিষ্ট নেই। আমার কাছে লবণও নেই।

তিনি আরও বলেন, তার বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তিনি একটি ডরমিটরিতে পুনর্বাসনের আশা করছেন। সরকার দ্রুত এ ব্যবস্থা করবেন বলেও আশা করছেন। 

"আমরা শীতার্ত" উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা নতুন আবাসনের জন্য অপেক্ষা করছি। 


জেইনেপের মতো অনেকেই নতুন আবাসের জন্য অপেক্ষা করছে। পাশপাশি অনেকেই আশ্রয় নিচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতেই। কিন্তু এসব ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোকে অনিরাপদ বলছে কর্তৃপক্ষ। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ভবন এখন একেকটা মৃত্যুফাঁদ। সামান্য ধাক্কায় ভেঙে যেতে পারে এগুলো। ফলে এসব ভবনে থাকার অর্থ, যেকোনো সময় নতুন করে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া।  

তুর্কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুলেমান সোয়লু জনগণকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক ভবনগুলোতে প্রবেশ না করার আহ্বান জানিয়েছেন।   

তিনি বলেছেন, সরকারি ঘোষণার পরই এসব ভবন ব্যবহার করা উচিত। কর্তৃপক্ষ অনিরাপদ ভবনগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করবে। 

 

তুরস্কের বেসরকারি সংস্থা আনাদোলু হাল্ক ভে বারিস প্ল্যাটফর্মু (এএইচবিএপি) বা আনাতোলিয়ার পিপল অ্যান্ড পিস প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়কারী গোনকা আকপিনার বলেন, এই অবস্থার উন্নতি করাই হল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার৷

তিনি আরও বলেন, মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজন হলো নিরাপদ ও উত্তপ্ত ঘর। 

তাছাড়া স্বাস্থ্যবিধি এবং স্যানিটেশন সমস্যা জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে জানান মোরা। 

এদিকে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে তুর্কি কর্তৃপক্ষের সতর্কতা সত্ত্বেও, ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা তাদের ক্ষতিগ্রস্থ বা ধসে পড়া বাড়িতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে। তারা বিপদ মাথায় নিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। 

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, সাংবাদিকরা অনেক লোককে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখেছে। ভেঙে পড়া দেয়াল আর ছাদের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে তারা নথিপত্র, আসবাবপত্র এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অনেকেই খুঁজছেন নিখোঁজ স্বজনদের লাশ। 


দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এএফএডিসহ সরকারি কর্মকর্তারা বারবার বাসিন্দাদের তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে ফিরে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করে বলছেন যে, ধ্বংসস্তুপ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বিপদ ডেকে আনছে।

সবশেষ সোমবার (২০ ফেব্রুয়ারি) যখন নতুন ভূমিকম্পে তুরস্ক আবারও কেঁপে উঠে, সে সময় জিনিসপত্র উদ্ধার করতে গিয়ে কমপক্ষে ছয় জন নিহত হয়। অনেকেই নতুন করে চাপা পড়েন ধ্বংসস্তূপে। আহত হয় আরও ছয় হাজার মানুষ, যাদের বেশিরভাগই সে সময় এসব ভবনে অবস্থান করছিলেন।   

স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াসির বায়রাক্কি বলেন, আমাদের যা কিছু আছে আমরা বাঁচানোর চেষ্টা করছি কারণ অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। 

তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য বা নতুন গৃহস্থালির পণ্য কেনার জন্য তাদের কাছে পর্যাপ্ত সংস্থান নেই বলেও জানান তিনি। 

২৮ বছর বয়সী প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপ ওয়েল্ডার আরও বলেন, আমরা মৃতদের ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু যেহেতু আমরা বেঁচে গেছি, আমরা যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা বের করার চেষ্টা করছি।


যদিও ভূমিকম্পের পরপরই তুরস্কের এসব শহর পুনর্নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।

এরইমধ্যে প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে, যেসব ভবনের বেশির ভাগ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে। 


একাত্তর/আরবিএস