ভারতের গুজরাট রাজ্যের গোধরায় সাবরমতী এক্সপ্রেসে আগুন লাগানোর ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত আট আসামির জামিন আবেদন মঞ্জুর করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের বেঞ্চ গোধরাকাণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত ওই আসামিকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেয়ার জন্য নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দিয়েছে।
জানা গেছে, অভিযুক্ত আট ব্যক্তি ১৭ বছর ধরে জেলবন্দি রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের জামিনে মুক্তি দেওয়ার জন্য শীর্ষ আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের বেঞ্চ।
এদিকে জেলে আচরণগত কারণে আরও চার জন আসামির জামিন আবেদন খারিজ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ডিসেম্বরে গোধরাকাণ্ডের অন্য এক আসামি, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফারুকের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেছিল প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ।
ভারতের শীর্ষ আদালতে ওই আট আসামির জামিনের বিরোধিতা করেন গুজরাত সরকারের আইনজীবী তথা দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তার যুক্তি ছিল, মহিলা, শিশুসহ ৫৯ জনকে পুড়িয়ে মারার মতো জঘন্য অপরাধে জড়িতদের মুক্তির প্রয়োজন নেই।
এ বিষয়ে মেহতা বলেন, গোধরায় নিছক ট্রেনে আগুন ধরানোর ঘটনা ঘটেনি। ওই হত্যাকাণ্ডের দোষীরা পরিকল্পিত ভাবে সাবরমতী এক্সপ্রেসের এস-৬ কামরার দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে খুনের উদ্দেশ্যে আগুন ধরিয়েছিল।
অন্যদিকে আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী জানান, গুজরাট হাই কোর্টের সাজার রায় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অভিযুক্তদের অনেকেই শীর্ষ আদালতে আবেদন জানিয়েছেন। সেই আবেদনগুলো এখনও বিচারাধীন। কিন্তু তারা ১৭ বছর ধরে টানা জেলবন্দি রয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০০২-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি গোধরায় সাবরমতী এক্সপ্রেসে করসেবকদের পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটে। ট্রেনের এস-৬ কোচের অগ্নিকাণ্ডে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়। তাদের অধিকাংশই ছিলেন অযোধ্যা থেকে ফেরা করসেবক। সেই ঘটনার পরই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে গুজরাটজুড়ে।
অভিযোগ ওঠে, সরকারি মদতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা হামলা চালায় সে রাজ্যের মুসলিমদের ওপর। দাঙ্গার বলি হন হাজারেরও বেশি মানুষ।
ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সে সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনিও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। দাঙ্গার জন্য মোদিইকে দায়ি করেন বিরোধীদলসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
সবশেষ চলতি বছর বিবিসির এক তথ্যচিত্রেও মোদিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: সুদানে ঈদের দিনেও লড়াই অব্যাহত, নিহতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়ালো
২০০২ সালের ঘটনা তদন্তে সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছিল। গুজরাট সরকারের তরফে গঠন করা হয় একাধিক কমিশনও। গোধরাকাণ্ডের তদন্তে গুজরাত সরকারের গঠিত নানাবতী-মেহতা কমিশন মত দিয়েছিল, ট্রেনে আগুন নিছক দুর্ঘটনা নয়, এর পিছনে ষড়যন্ত্র ছিল। গোধরা অগ্নিকাণ্ডের ৯ বছর পরে ২০১১-র পয়লা মার্চ ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গোধরাকাণ্ডে ৩১ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে। তাদের মধ্যে ১১ জনের ফাঁসির সাজা হয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় ২০ জনের। মুক্তি পান অভিযুক্ত ৬৩ জন।
শাস্তির রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দোষী সাব্যস্তরা গুজরাট হাইকোর্টে একাধিক মামলা করে। ২০১৭-র অক্টোবরে গুজরাট হাইকোর্ট ১১ জনের ফাঁসির সাজা রদ করে যাবজ্জীবন জেলের সাজা দেয়। ২০ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। এদিকে, গুজরাট হাইকোর্টের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জেলবন্দিদের দায়ের করা মামলা এখনও সুপ্রিম কোর্টে বিবেচনাধীন।
যদিও গোধরা পরবর্তী দাঙ্গায় দোষী সাব্যস্ত অনেকেই ইতিমধ্যে গুজরাটের বিজেপির সরকারের সম্মতিতে সাজার মেয়াদ শেষের আগেই জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
একাত্তর/আরবিএস