অমুসলিম হয়েও সব রোজা রাখলেন ডাচ তরুণ!

অমুসলিম হয়েও রমজান মাসের সবগুলো দিনে সিয়াম সাধনা করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন এক ডাচ নাগরিক। তার নাম মিকা স্টিভেনস। ১৫ বছরের এই ডাচ তরুণ রমজান মাসের শুরুর দিন থেকেই রোজা রাখতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত তা পালন করেন।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসি নিউজের আরবি সংস্করণ নেদারল্যান্ডসের এই তরুণের সিয়াম সাধনার বিষয়টি নিয়ে এক প্রতিবেদন করেছে। সেখানে উঠে এসে একজন অমুসলিম তরুণের ইসলাম ধর্ম নিয়ে আগ্রহের বিষয়টি। রমজানের মাসে রোজা রাখা শুরু করেন মিকা জানান, পুরো মাসই রোজা রাখার ইচ্ছা ছিলো।

কলেজ শিক্ষার্থী রিকা স্টিভেনস জানান, দুই বছর আগে তার চেয়ে তিন বছরের বড় ভাই রোজা রাখা শুরু করেন এবং গোপনে ইসলাম গ্রহণ করে। তাদের পরিবারের কী প্রতিক্রিয়া হবে এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। কারণ এ ধরনের পদক্ষেপ তাদের খ্রিস্টান পরিবারে গ্রহণযোগ্য ছিলো না।

তিনি বলেন, কিন্তু যখন বাবা-মা এই বিষয়ে জানতে পারেন এবং তাদের সাথে কথা বলেন, তখন তারা তার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। বলেছে তারা ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির জন্য উন্মুক্ত। আমাদের বাবা ধার্মিক নন। তবে মা খ্রিস্টান ধর্ম চর্চা করেন। পরিবার মেনে নেয়ার আমি সিদ্ধান্ত নেই রোজা রাখার।

মিকা জানান, তার ভাই ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত একজন খ্রিস্টান ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি ইসলামিক বই পড়ার পাশাপশি তার মুসলিম বন্ধুদের সাথে এই নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে ভাই গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। মিকা যোগ করেন, তার ভাই যা চেয়েছিলেন তা পেয়েছেন।

মিকা বলেন, আপাতদৃষ্টিতে এর কারণ হিসেবে মনে হয়েছে সে যা চাইত তা সে ইসলামের মধ্যে পেয়েছে। তিনি বিবিসিকে ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে তিনি ও তার ভাই ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। স্কুলে ও কর্মক্ষেত্রে তার ও তার মুসলিম বন্ধুদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ধর্ম নিয়ে অনেক বিস্তারিত কথা হত।

মিকার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো, কেন তিনি একজন খ্রিস্টান হয়েও রোজা রাখেন এবং ইসলামের পথে চলেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি অনুভব করি যে আমি ঈশ্বরের কাছাকাছি। বলেন, প্রথমে আমার ভাই আমাকে ইসলামের মূল নীতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং তার বিশ্বাস সম্পর্কে ব্যাখ্যা করে।

তিনি বলেন, আমার ভাই লেভি একমাত্র ব্যক্তি যার সাথে আমি ধর্ম নিয়ে বেশি আলোচনা করি এবং তার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমার স্কুলের বন্ধুদের সাথেও এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। এমন কী আমাদের এই আলোচনায় ধর্ম পালন করেন না এমন অনেক সহকর্মীও যোগ দেয়।

মিকা স্টিভেনস ও তার সিরিয়ান বন্ধু মিকা ছবি: বিবিসি নিউজ আরবি।

মিকা স্টিভনস আরও বলেন, আমি ভাইয়ের কাছে থাকা বইগুলো পড়ি এবং বোঝার চেষ্টা করি। বিশেষ করে কিছু অসঙ্গতি বা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সম্পর্কে বুঝতে চাই। যেগুলো আমাকে বইগুলো পড়া এবং গবেষণা করে জানতে আরেও আগ্রহী করে তুলেছে। পরিশেষে বলা যায়, সব ধর্মেই একজন স্রষ্টা রয়েছেন।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, আমি রমজানের সময় রোজা রাখা শুরু করেছি, এটা সত্যি। কিন্তু আমি আমার খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি বিশ্বস্ত। রোজা রাখতে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে সেটি হলো- স্রষ্টার নৈকট্য লাভের আশা। আমার অবস্থান নিয়ে ভাই ও বন্ধুরা কখনও দ্বিমত করেনি, সমর্থন দিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত দশ বছরে হল্যান্ডসহ ইউরোপে মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে, বিশেষ করে সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে যুদ্ধ শুরু হবার পরে ইউরোপে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। হাজার হাজার মুসলিম উদ্বাস্তু ইউরোপে প্রবেশ করেছে।

২০২১ সালে নেদারল্যান্ডসের সামাজিক সংহতি ও সুস্থতার ওপর একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ বছর বয়সী বা তার বেশি বয়সী ডাচ জনসংখ্যার ৫৮ শতাংশ কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায় বা মতাদর্শের অন্তর্ভুক্ত নয়। আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কে অবনতির সাথে সাথে, কিছু ডাচ অন্যান্য ধর্মকে অনুসরণ করে।

ইসলামের মতো বিভিন্ন ধর্ম গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে আরব উদ্বাস্তুদের জীবন-যাপনের রীতি ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। প্রতি রমজানেই দেশটিতে মুসলিম বাড়ছে। মিকার এক বন্ধু আছেন। নাম গাবি। তিনি সিরিয়া থেবে হল্যান্ডে অভিবাসী হয়েছেন। মিকার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব গাবির।

২০১৬ সালে পাঁচ বছর বয়সে গাবি বাবা-মার সঙ্গে উদ্বাস্তু হয়ে নেদারল্যান্ডসে আসে। মিকা জানান, গাবি ৯ বছর বয়স থেকে রোজা রাখতে শুরু করে। কিন্তু বিষয়টি তার বাবা-মা জানতো না। জানার পর তারা গাবিকে বকাঝকা করে। কিন্তু তারপরেও গাবি রোজা রাখা বন্ধ করেনি।

গাবির মা বিবিসিকে বলেন, একদিন গাবি স্কুল থেকে ফিরে এসেছিলো তার সঙ্গে থাকার টিফিনের বক্স নিয়ে। বক্স খুলে দেখতে পাই সে কিছু খায়নি। জানতে চাইলে গাবি জানান, সে তার স্কুলের অন্যান্য বন্ধুদের মতোই রোজা রাখছেন। এ কারণে উপবাস করছেন। তাকে এজন্য বকা দেয়া হলেও, রোজা রাখা বন্ধ করেনি।