মধ্যপ্রাচ্যের কসাই হিসাবে খ্যাত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম শুনলেই আজকাল শুধু মুসলিম বিশ্বের মানুষরাই নন, বিবেকবান যে কোন মানুষও ধিক্কার আর ঘৃণা জানাতে ভুল করেন না। হাজার হাজার নিরীহ ফিলিস্তিনিদের রক্তে রঞ্জিত খুনে এই ব্যক্তিটি এখন সফর করছেন ইসরাইলের পরমাত্মা এবং সকল অপকর্মের দোসর আমেরিকাতে। তবে তার সফর খুব একটা সুখের হয়নি।
যেই ব্যক্তি শয়নে স্বপনে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না, সেই নেতানিয়াহু যে, বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে গাজা উপত্যকা নিয়ে মিথ্যাচার করবেন সেটি আর নতুন কি! তার মিথ্যাচার আর আক্রমণাত্মক কথায় প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঝড় উঠেছে আমেরিকার মাটিতেই। নেতানিয়াহুর সমালোচনায় মুখর হয়েছেন আমেরিকার শীর্ষ রাজনীতিকরাও। কিছুতেই নিতে পারছেন না জায়নবাদি নেতা দম্ভ।
মঙ্গলবার, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অধিবেশনে নেতানিয়াহুর দেওয়া ভাষণটি ছিলো আক্রমণাত্মক মন্তব্য আর মিথ্যাচারে ভরা। প্রায় দশম মাসে পদার্পণ করা গাজা যুদ্ধ নিয়েও, নানা ধরনের মিথ্যা দাবি করেছেন তিনি। মার্কিন আইনসভায় নেতানিয়াহু যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন ওয়াশিংটন ডিসির রাস্তা এবং ক্যাপিটল হিল ভবনের সামনের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ ইসরাইলি নেতার সফরের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করছে।
গাজাবাসীর জন্য খাদ্য সহায়তা, বেসামরিক লোকজনের সুরক্ষা এবং হামাসের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে সমানে মিথ্যাচার করে গেছেন নেতানিয়াহু। এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করে প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে বলেছে, নেতানিয়াহু ডাহা মিথ্যা কথা ছাড়া আর কিছুই বলেননি। ভাষণে নেতানিয়াহুর আত্মম্ভরিতার দিকটিই প্রতিফলিত হয়েছে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজার বাসিন্দাদের না খাইয়ে রাখার যে অভিযোগ করেছে সেটি পুরোপুরি বানোয়াট কথা। ইসরাইল গাজায় ত্রাণবাহী ৪০ হাজার ট্রাক ঢুকতে দিয়েছে। তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় ত্রাণবাহী ২৮ হাজার ১৮টি ট্রাক প্রবেশ করেছে। যেসব পথ দিয়ে গাজায় এসব ট্রাক ঢুকেছে সেসবের মধ্যে রাফা ক্রসিং ছিল না।
ইসরাইলি নেতা দাবি করেছেন, গাজায় বেসামরিক লোকদের সুরক্ষায় তার প্রতিরক্ষা বাহিনী- আইডিএফ অনেক কিছু করেছে। নিরাপদ স্থানে যেতে লাখ লাখ প্রচারপত্র ফেলেছে, খুদে বার্তা পাঠিয়েছে ও হাজার হাজার ফোন কল করেছে। বাস্তবে, আইডিএফ ফিলিস্তিনিদের লক্ষ করে কিছু প্রচারপত্র ফেলেছে সেসবের উদ্দেশ্য ছিল, কোনো এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলার অভিপ্রায় সম্পর্কে ফিলিস্তিনিদের অবগত করা।
কিন্তু বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের হামলার শিকার হওয়া থেকে রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে এসব পদক্ষেপ। চলতি সপ্তাহেও এ দৃশ্য দেখা গেছে। খান ইউনিস থেকে সরে যেতে ফিলিস্তিনিদের নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইল । সেখানে আনুমানিক চার লাখ মানুষের বসবাস। নির্দেশে ফিলিস্তিনিদের কোথায় যেতে হবে, সেসব বিষয়ে উল্লেখ করা নেই। আবার নির্দেশের পরও সংশ্লিষ্ট এলাকায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি সেনারা।
ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, হামাস আত্মসমর্পণ করলে, নিরস্ত্র হলে ও সব জিম্মিকে ফিরিয়ে দিলে গাজায় যুদ্ধ শেষ হতে পারে আগামীকালই। কিন্তু হামাস তা না করলে ইসরাইল লড়াই চালিয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে, গাজায় এমনকি যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার বিষয়েও কোনো কিছু উল্লেখ নেই নেতানিয়াহু। যদিও তিনি সমঝোতা চলছে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু আগের সব চেষ্টা নেতানিয়াহু একাই নস্যাৎ করে দিয়েছেন।
কংগ্রেসে নেতানিয়াহু যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে আশাহত হয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক দলের আইন প্রণেতাদের অনেকে। শুধু তারাই নন হাজার হাজার মার্কিন নাগরিককে হতাশ করেছেন নেতানিয়াহু। কেননা তারা আশা করেছিলেন ভাষণে গত ৯ মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানের বিষয়ে কথা বললেন ইসরাইলি নেতা। কিন্তু তিনি তা না করায় ক্যাপিটল হলের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক।