শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট বামপন্থী অনুড়া দিশানায়েকে

শ্রীলঙ্কায় গণ-বিক্ষোভের মুখে রাজপাকসে সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বামপন্থী অনুড়া কুমারা দিশানায়েকে।

শনিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোনো প্রার্থী এককভাবে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দের প্রার্থীকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ভোট গণনা করা হয়। শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে দ্বিতীয়বার ভোট গণনার ঘটনা ছিলো এই প্রথম। 

দুই শীর্ষ প্রতিযোগী এনপিপি দলের অনুড়া কুমারা ও বিরোধী দলের নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা ছাড়া বাকি প্রার্থীরা নির্বাচনী লড়াই থেকে বাদ পড়ে যান তুলনামূলক কম ভোট পাওয়ায়।

এগিয়ে থাকা দুই প্রার্থীকে দ্বিতীয় পছন্দের প্রার্থী হিসেবে যারা ভোট দিয়েছিলেন সেগুলো পরে আবার গণনা করা হয়। সেই গণনা শেষ হওয়ার পর দেশটির নির্বাচন কমিশন অনুড়া কুমারাকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে।

শ্রীলঙ্কার নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৪২ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন অনুড়া। সোমবারই নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, শনিবারের নির্বাচনে ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্রের ১ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

দ্য হিন্দু ও শ্রীলঙ্কার ডেইলি মিররের প্রতিবেদনও জানানো হয়, অনুড়া কুমারা পেয়েছেন ৫৬ লাখ ৩৪ হাজার ৯১৫ ভোট, যা মোট ভোটের শতকরা ৪২ দশমিক ৩১ ভাগ।

অন্যদিকে সাজিথ প্রেমাদাসা পেয়েছেন ৪৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩৫ ভোট, শতকরায় ৩২ দশমিক ৭৬ ভাগ।

রনিল বিক্রমাসিংহে পেয়েছেন ২২ লাখ ৯৯ হাজার ৭৬৭ ভোট (শতকরা ১৭ দশমিক ২৭ ভাগ)।

চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ২০২২ সালে দেশটিতে গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়ে রাজাপাকসে ক্ষমতাচ্যুত হলে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পান বিক্রমাসিংহে। এরপর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো দেশটিতে। শ্রীলঙ্কার এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হন ৩৮ জন।

এদিকে অনুড়া কুমারার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কায় রাজপাকসে পরিবারের টানা দেড় দশকের বেশি সময়ের একক আধিপত্যের অবসান ঘটলো। ১৯৪৮ সালে শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতার পর থেকে শ্রীলঙ্কা শাসন করেছে দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল বা তাদের জোট বা তাদেরই কোনো অংশ।

এর মধ্যে একটি রাজপাকসে পরিবারের নেতৃত্বাধীন দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি)। দলটি থেকে একাধিকবার প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন মাহিন্দা রাজপাকসে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগের আগে সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট ছিলেন তার ছোট ভাই গোতাবায়া রাজপাকসে।

২০১৯ সালে অনুড়া কুমারা দিশানায়েকে তৈরি করেছিলেন এনপিপি। ছাত্র বয়স থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ২০০০ সাল থেকেই পার্লামেন্টের সদস্য অনুড়া। ২০১৯ সালেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়েছিলেন তিনি। তবে, মাত্র তিন শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার সেই নেতাই হলেন কলম্বোর মসনদের অধিকারী।

sri-lanka-preasident1

দিশানায়েকের প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই ছিলো বিশিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারের পরিচিত মুখ। নমাল রাজপাকসে, যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজপাকসের বড় ছেলে। সজিথ প্রেমাদাসা সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমদাসার ছেলে। আর রনিল বিক্রমাসিংহে, লঙ্কার প্রথম প্রেসিডেন্ট জে আর জয়াবর্ধনের ভাগ্নে।

এখন এসব ডাকসাইটে প্রার্থীদের তাদের পেছনে ফেলে দাঁড়িয়ে আছেন অনুড়া কুমারা দিশানায়েকে। তার জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) এর আগে কখনো ক্ষমতার কাছাকাছিও ছিলো না। বরং দু’বার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মার্ক্সবাদী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছে। সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।

দিশানায়েকের জন্ম এক গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক করেছেন তিনি। স্কুল জীবন থেকে জেভিপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০০০ সালে প্রথম সংসদ সদস্য হন। অনুড়া ২০১৪ সালে জেভিপির নেতৃত্ব নেন। তারপর থেকে তিনি দলের ভাবমূর্তিকে সহিংসতা থেকে আলাদা করায় ব্রতী হন।

১৯৭১ এবং তারপর ১৯৮০-এর দশকের শেষদিকে এই দল মার্ক্সবাদে অনুপ্রাণিত বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলো। রাষ্ট্র প্রতিশোধ–পাল্টা প্রতিশোধ নিতে দেরি করেনি। গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন, অপহরণ ও গণহত্যায় দল সংশ্লিষ্ট কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষ নিহত হয়। এর মধ্যে দলের প্রতিষ্ঠাতা রোহানা উইজেবিরাও নিহন হন।

অভ্যুত্থান ব্যর্থ হবার পর দিশানায়েকে দলের পলিটব্যুরো সদস্য হন। দল সহিংস পথ ছেড়ে দেয়। জেভিপির দলের নেতৃত্ব নেন ২০১৪ সালে।

সে বছর মে মাসে বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি দলের অতীত সহিংস পথকে ভুল বলে উল্লেখ করেন। জেভিপি তার অতীত নিয়ে এই একবারই এমন কথা বলেছেন।