পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তেহরিক-ইনসাফ (পিটিআই) দলে প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ঢাকা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশকে ঘিরে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদ। শহর প্রবেশ মুখে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ইমরান সমর্থকদের দফায় দফায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সংঘর্ষে একাধিক হতাহতের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ইসলামাবাদে প্রবেশে বাধা দেয়ার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। তবে পিটিআই সরকারের এমন বক্তব্যকে মিথ্যা অপপ্রচার হিসাবে উল্লেখ করেছে।
পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআই সমর্থকরা মঙ্গলবার রাজধানী ইসলামাবাদের ডি-চকে পৌঁছেছে। এরপরই ইসলামাবাদে পুলিশ ও পিটিআই কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। খানের সমর্থকরা ডি-চক থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে ফয়সাল অ্যাভিনিউতে রয়েছে।
আদালতের আদেশ এবং সরকারি হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে রোববার পাকিস্তানের বিভিন্ন শহর ও জেলা থেকে পিটিআই সমর্থকরা গাড়িবহর নিয়ে ইসলামাবাদের দিকে রওনা হয়। ইসলামাবাদে পৌঁছানোর পর নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পিটিআই সমর্থকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। শেষ খবর পর্যন্ত সংঘর্ষ চলছিলো।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুঁড়ছে। গোলার প্রভাব রাজধানীর আবপাড়া চক পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ায় সেখানের সবচেয়ে মার্কেট বন্ধ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাওয়ালপিন্ডি থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যদের ডাকা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ইসলামাবাদে এক হাজার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোতে রেঞ্জার্স এবং ডি-চকে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
এর আগে দেশটির বেশ কয়েকটি শহরে পিটিআই সমর্থক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। ইসলামাবাদ পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছেন, চলমান বিক্ষোভ চলাকালে রাজধানী থেকে পুলিশ ৫০০ জনেরও বেশি পিটিআই নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া গ্রেপ্তার হয়েছে আরও হাজারো খান সমর্থক।
বিক্ষোভকারীদের দমাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে সরকার । দাঙ্গাকারীদের দেখামাত্র গুলি করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মনে করা যে কোনো এলাকায় কারফিউ জারি করার ক্ষমতা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয়েছে।
ইমরান খানের সমর্থকরা ইসলামাবাদের দিকে এগিয়ে আসার পথে দুই দিন ধরে সংঘর্ষ চলছে। গত সপ্তাহে দেশটির প্রশাসন ইসলামাবাদে দুই মাসের জন্য জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করে। আন্দোলনরারীরা ইসলামাবাদের রেড জোন ডি-চকে পৌঁছে গেছে। সেখানে সেনা মোতায়েন রয়েছে। এলাকায় বহু সরকারি ভবন আছে।
আল জাজিরা জানিয়েছে, ইমরান খানের সমর্থকরা ইসলামাবাদে প্রবেশ করেছে। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। চার নিরাপত্তা কর্মীর পাশাপাশি একজন আন্দোলনকারীও নিহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে; আলাদা এক ঘটনায় আরোও একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহতের খবর শুনা যাচ্ছে; তবে উত্তেজনা এবং গুজবের মধ্যে কোনো সংবাদই এখন সঠিক ভাবে যাচাই করা যাচ্ছে না।
সরকার শিপিং কন্টেইনার দিয়ে ইসলামাবাদের রাস্তায় অবরোধ করে এবং সারা দেশ থেকে পুলিশকে বাসে করে আনা হয়। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের তাদের বিক্ষোভের জন্য একটি বিকল্প স্থানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে।
সহিংসতা ঠেকাতে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। নিষিদ্ধ করা হয়েছে সভা-সমাবেশ। কার্গো কনটেইনার দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে ডি–চকের প্রবেশপথ। ইসলামাবাদে সংবিধানের ২৪৫ ধারা সক্রিয় করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও পিটিআই সমর্থকদের সমাবেশ ঠেকানো যায়নি। এড়ানো যায়নি সহিংসতা।
বৃহস্পতিবার একটি আদালত রাজধানীতে সমাবেশ নিষিদ্ধ করে এবং কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করলে গ্রেপ্তার হবে। পুলিশ শুক্রবার থেকে ইমরানেরর প্রায় ৪ হাজারেরও বেশি সমর্থককে গ্রেপ্তার করেছে। দেশটির কিছু অংশে মোবাইল এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।
বিক্ষোভ মিছিলের নেতৃত্ব দেয়া পিটিআই নেতা ও খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আলি আমিন গান্ডাপুর কর্মীদের উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেছেন, আমরা পিছু হটব না এবং ইসলামাবাদ পৌঁছানো পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। অর্থাৎ সরকার এবং পিটিআই উভয়ই তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
পাকিস্তানের বিরোধী দলীয় নেতা ইমরানের স্ত্রী বুশরা বিবি ইসলামাবাদের ডি-চক এলাকায় বিক্ষোভ করার অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তাই ডি–চকের পরিবর্তে সাংজানি এলাকায় বিক্ষোভ করার চেষ্টা বুশরা বিবির এই অনড় অবস্থানের কারণে কার্যত ভেস্তে গেছে।
ইমরান খানকে ২০২২ সালে একটি অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন তিনি এবং তার বিরুদ্ধে ১৫০টিরও বেশি অপরাধমূলক মামলা রয়েছে। তার দল পিটিআই বলছে, মামলাগুলো রাজনৈতিক, কর্তৃপক্ষ বলছে যে শুধুমাত্র আদালতই তার মুক্তি আদেশ দিতে পারে।
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে চলমান এই সংঘর্ষের ফলে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে শরিফ সরকার। বেশ কিছু দিন ধরে তারা আন্তর্জাতিক তহবিল (আইএমএফ) থেকে আর্থিক অনুদান নিয়ে দেশের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই অশান্তির ফলে দেশের অর্থনীতির দৈনিক ১৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।