একটা ভোটই বাংলাকে অনুপ্রবেশ মুক্ত করতে পারে: নরেন্দ্র মোদী

মোদী নয়, বিজেপিও নয়। মানুষের একটা ভোটই পশ্চিমবঙ্গকে অনুপ্রবেশ মুক্ত করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে ভোট দেওয়ার আহবান জানিয়ে মোদী বলেন, আপনারা একবার ভোট দিয়ে দিন, এই অনুপ্রবেশকারীরা সব পালাতে থাকবে। নাম না নিয়ে এভাবেই বাংলাদেশকে ইস্যু করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। 

শুক্রবার (২২ আগস্ট) কলকাতা মেট্রো রেলের সম্প্রসারণ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার পর সন্ধ্যায় কলকাতার কাছেই দমদম কেন্দ্রীয় কারাগার ময়দানে একটি রাজনৈতিক সভা থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতে ক্রমঃবর্ধমান অনুপ্রবেশ ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে মোদী বলেন, দিল্লির লালকেল্লা থেকে আমি দেশের একটা বড় চিন্তার কথা বলেছিলাম। অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই এই চিন্তা আরও প্রকট হচ্ছে। কলকাতা তথা গোটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সময়ের আগে চিন্তাভাবনা করেন। আজকাল আপনারা দেখেছেন, যে দেশকে উন্নত বলা হয়, যার কাছে ধনসম্পত্তির কোনো খামতি নেই, সেখানে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে দরদ উপচে পড়ছে। এই দেশ আর বেশিদিন অনুপ্রবেশকারীদের সহ্য করবে না।  

এ সময় জনসভায় উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্য মোদীর প্রশ্ন, অনুপ্রবেশকারীদেরকে দেশ থেকে চলে যাওয়া উচিত কিনা? ওদেরকে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত কিনা? এদেরকে কারা ফেরত পাঠাতে পারে? পশ্চিমবঙ্গকে কারা অনুপ্রবেশ মুক্ত করতে পারে? 

দর্শকদের কাছ থেকে উত্তর আসে মোদী। তখন মোদী বলেন, মোদি নয়, বিজেপিও নয়। আপনাদের একটা ভোটই পশ্চিমবঙ্গকে অনুপ্রবেশ মুক্ত করতে পারে। একবার ভোট দিয়ে দিন, এই অনুপ্রবেশকারীরা সব পালাতে থাকবে।  

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধী দলের জোট 'ইন্ডিয়া'র শরিক দলগুলোর বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশে মদদ দেওয়া ও তোষণের অভিযোগ আনেন মোদী। 

মোদী বলেন, ভারত নতুন প্রজন্মকে কর্মসংস্থান দিচ্ছে, তার দেশের নাগরিকদের সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু এই অনুপ্রবেশকারী আমাদের নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থান কেড়ে নিচ্ছে, আমাদের অবকাঠামোর উপরে প্রভাব ফেলছে, আমাদের মা-বোনেদের উপর উপরে অত্যাচার করছে- এই অনুপ্রবেশকারীদের আমরা ভারতে থাকতে দেবো না। সেই কারণেই ভারত সরকার অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে এত বড় অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু আমি হতবাক যে, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধী 'ইন্ডিয়া' জোটের রাজনৈতিকদলগুলো তোষণের রাজনীতির কাছে মাথা নোয়াচ্ছে। এই রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার জন্য অনুপ্রবেশকারীদের মদদ দিচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় এমনও দেখা গেছে যে তারা অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দিচ্ছে। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী একটা রাজ্য। যেভাবে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে, তাতে সামাজিক সংকট তৈরি করছে। কৃষকদের বোকা বানিয়ে তাদের জমি লুট করা হচ্ছে, আদিবাসীদের বঞ্চিত করে ওদের জমি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশ এই জিনিস আর সহ্য করবে না। এটাকে ঠেকাতেই হবে। এই কারণে স্বাধীনতা দিবসের দিন লালকেল্লা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ডেমোগ্রাফি মিশনের ঘোষণা দিয়েছিলাম। যারা আমাদের মানুষদের রুটি, রোজগার ছিনিয়ে নিতে এসেছেন, যারা ভুয়া নথি দিয়ে ভারতীয় পরিচয় পত্র তৈরি করে এদেশে রয়ে গেছে, তাদের এখান থেকে যেতেই হবে। আর এই কাজ সততার সাথে সম্পন্ন করতে হবে। এই কারণে তৃণমূলের সরকারকেও এ রাজ্য থেকে বিদায় নিতে হবে।  

এদিনের 'পরিবর্তন সংকল্প সভা' থেকে রাজ্যে ফের একবার পরিবর্তনের ডাক দিয়ে মোদী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন জরুরি। স্বাধীনতার পর থেকে এরাজ্যে প্রথমে কংগ্রেস, পরে বামেরা দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলো। এরপরে ১৪ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং মা-মাটি-মানুষের স্লোগানকে ভরসা করে তৃণমূলকে ক্ষমতায় এনেছেন। কিন্তু বিগত কংগ্রেস এবং বামেদের চেয়ে তৃণমূলের শাসনামলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গেছে। 

তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির বেড়েছে, মা-বোনেদের উপর অত্যাচার বেড়েছে। তাই যতদিন পর্যন্ত বাংলায় তৃণমূলের সরকার থাকবে ততদিন বাংলার উন্নয়ন ঘটবে না। এই কারণে বাংলার প্রতিটি মানুষ বলছে তৃণমূল গেলে, তখনই রাজ্যে আসল পরিবর্তন আসবে। আর এটা কেবল স্লোগানেই নয়, কার্যক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তন জরুরি। আর কেবলমাত্র বিজেপিই সেই আসল পরিবর্তন আনতে পারে।

সম্প্রতির লোকসভায় পেশ হওয়া দুর্নীতি বিরোধী বিল নিয়েও মুখ খুলেছেন মোদী। তিনি বলেন, নিম্ন পদে আসীন একজন সরকারি কর্মচারীও ৫০ ঘণ্টা কারাগারে থাকলে দুর্নীতির অপরাধে তার চাকরি চলে যায়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী, অন্য মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রী কারাগারে গেলে ওদের জন্য কোনো আইন নেই। তৃণমূলের এক মন্ত্রী (পার্থ চট্টোপাধ্যায়) শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে আজ পর্যন্ত কারাগারে রয়েছেন। তার ঘর থেকে বিপুল পরিমাণ রুপি পাওয়ার পরেও মন্ত্রী পদ ছাড়তে চাননি। রেশন দুর্নীতি মামলায় তৃণমূলের আরেক মন্ত্রীকে (জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক) কারাগারে যেতে হয়েছিলো কিন্তু তার পরেও নিজের পদ ছাড়েননি। আসলে এরা সংবিধান বা জনতার চিন্তাভাবনাকে কোনো পরোয়া করে না। এই ধরনের লোক যারা জনগণকে ধোঁকা দেয় তাদের সরকারে থাকার কোন অধিকার রয়েছে কি? আপনারাও দেখেছেন যে মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত কারাগারে গিয়েছেন এবং সেখান থেকে সরকার চালাচ্ছে। এটা গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অপমান। কিন্তু মোদী সংবিধানের এই অপমান হতে দেখবে না। এইজন্য মন্ত্রী হোক মুখ্যমন্ত্রী হোক বা প্রধানমন্ত্রী সকলকেই এই আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। কিন্তু তৃণমূল দুর্নীতি বিরোধী এই আইনের বিরোধিতা করছে। 

এর পাশাপাশি বাংলার উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকারের পাঠানো অর্থ নয়ছয় করা, কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোকে রাজ্যে বাস্তবায়িত করতে বাধা দেওয়া, নারীদের উপর অত্যাচারের অভিযোগও তুলেছেন মোদী। তিনি বলেন, ভারত সরকার দিল্লি থেকে যে অর্থ রাজ্যের উন্নয়নের পাঠায়, সেটা সাধারণ মানুষের উন্নয়নের খরচ হয় না। সেটা মহিলাদের জন্য ব্যবহার করা হয় না। সেই অর্থ তৃণমূল তাদের ক্যাডার পুষতে খরচ করে। এই কারণে গরিবদের উন্নয়নের নিরিখে দেশের অনেক রাজ্যের থেকে পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে পড়েছে। অথচ ত্রিপুরা, আসামের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে জনগণ প্রতিটি গরীব মানুষ উন্নয়নের সেই সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন।