মাদুরোর ঘটনা কী ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে দেশটির অভিজাত কমান্ডো ডেল্টা ফোর্স ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাসে তাঁর বাসভবন থেকে তুলে নেয়ার ঘটনা গভীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোকে বন্দির ঘটনা ইরানের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এনিয়ে কিছু বিষয় নজরে এনেছেন তারা। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণের খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পরেই ইসরাইলি রাজনীতিবিদ ইয়ার লাপিদ তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে, ইরানের শাসকদের সেদিকে কড়া নজর রাখা উচিত।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করা এবং ইরানের ওপর নতুন করে হামলার হুমকি দেয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে মাদুরোকে জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত করার এই ঘটনা ঘটল। যদিও কারাকাস ও তেহরানের সঙ্গে মার্কিন উত্তেজনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, এই নতুন আইনহীনতা সব কিছুকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্প যদি এখন ‘সার্জিক্যাল’ উপায়ে শাসনক্ষমতা পরিবর্তনের নেশায় মেতে ওঠেন বা নেতানিয়াহুকে একই ধরনের পদক্ষেপের অনুমতি দেন, তবে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধের পক্ষে থাকা গোষ্ঠীগুলো যে বাড়তি সাহস পাবে, তা বোঝা যাচ্ছে।

তিনি আরও যোগ করেন, মাদুরোর অপহরণ ইরানকে এমন কিছু করতে উসকে দিতে পারে, যা সামরিক পদক্ষেপের সূচনা করবে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি মনে করেন, ভেনিজুয়েলায় মার্কিন পদক্ষেপ ট্রাম্পের চূড়ান্ত লক্ষ্যকেই স্পষ্ট করে, যা কূটনীতির সুযোগকে আরও সংকুচিত করছে। 

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, তেহরান ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এমন কোনো আলোচনায় আগ্রহী নয় যেখানে আগেভাগেই তাদের পূর্ণ আত্মসমর্পণের সংকেত দেয়া হচ্ছে। ফলে সংঘাতের পথই এখন বেশি উন্মুক্ত।

ইরান-ভেনেজুয়েলা মৈত্রী

মাদুরোকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার আগে কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলা সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তারা মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ আনেন এবং ট্রাম্প যুক্তি দেন, ভেনিজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের ওপর ওয়াশিংটনের অধিকার রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কোনো প্রমাণ ছাড়াই মাদুরোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে অভিযোগ করেন, কারাকাস লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে এই অঞ্চলে ঘাঁটি গড়তে সাহায্য করছে। মাদুরো ইরানের একজন ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং নিষেধাজ্ঞা কবলিত এই দুই দেশ তাদের বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছিল। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর মাদুরোর বিদায়ে ইরানের মিত্রদের বলয় আরও সংকুচিত হতে পারে।

ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক আগ্রাসন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার চরম লঙ্ঘন।

তেহরানের প্রতি ট্রাম্পের হুমকি

গেলো সপ্তাহে ফ্লোরিডায় নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প হুমকি দেন, ইরান যদি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করে তবে আবারও বোমা হামলা চালানো হবে। তিনি বলেন, আমরা তাদের ওপর চরম আঘাত হানবো। 

উল্লেখ্য, গত জুনে ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, যাতে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রও সেই হামলায় যোগ দিয়ে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলা চালায়। তবে ট্রাম্প সেই যুদ্ধকে সফল দাবি করলেও ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকে আছে। ইরানও এর জবাবে ইসরাইলে শত শত রকেট হামলা চালিয়েছিল।
ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যদি ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলা করতে প্রস্তুত রয়েছে।

মাদুরো পরবর্তী ভেনেজুয়েলা

মাদুরোকে সরিয়ে দিলেও ভেনিজুয়েলায় এখনো বর্তমান শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতন ঘটেনি। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জোর দিয়ে বলেছেন, মাদুরোই দেশের একমাত্র নেতা। তিনি এই অপহরণের পেছনে ইসরাইলের হাত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এর জবাবে ট্রাম্প রদ্রিগেজকেও হুমকি দিয়ে বলেছেন, মার্কিন দাবি না মানলে তাকে মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য দিতে হবে। ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় স্থল আক্রমণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেছেন, আমরা প্রয়োজনে সেখানে সেনা পাঠাতে দ্বিধা করব না।

রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেলর গ্রিনের মতো সমালোচকরা মনে করছেন, ভেনিজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের ফলে জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, যুক্তরাষ্ট্র তা সামাল দিতে পারবে। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা যুদ্ধের সময় ইরান বন্ধ করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ভেনিজুয়েলার তেল তখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে।