গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় এক ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে। এই আকস্মিক ও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ লাতিন আমেরিকা জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। সোমবার সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার অবস্থানে অনড় থেকে কলম্বিয়া, কিউবা এবং মেক্সিকো সরকারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
তিনি দাবি করেছেন, মাদক পাচার রোধ এবং পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন স্বার্থ সুরক্ষায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এসব দেশের সরকারকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে দীর্ঘদিনের পুরনো উত্তেজনাকে আবার উসকে দিয়েছে। লক্ষ্যবস্তু হওয়া দেশগুলোর মধ্যে অনেক সরকারই ওয়াশিংটনের এই হস্তক্ষেপকে মেনে নিতে নারাজ, কিন্তু তাদের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষে মার্কিন সামরিক শক্তিকে প্রতিহত করার সক্ষমতা নেই।
লাতিন আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বিশ্বের মধ্যে শীর্ষস্থানে এবং তাদের সামরিক বাজেট ১০টি শক্তিশালী দেশের মোট বাজেটের চেয়েও বেশি। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল ৮৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির প্রায় ৩.১ শতাংশ।
২০২৫ সালের 'গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার' র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকায় ব্রাজিলের সামরিক শক্তি সবচেয়ে বেশি, বিশ্বে ১১তম। এর পরে মেক্সিকোর অবস্থান ৩২তম, কলম্বিয়া ৪৬তম, ভেনেজুয়েলা ৫০তম এবং কিউবা ৬৭তম। সক্রিয় সেনা সদস্য, যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্ক, নৌবহর কিংবা বাজেট- সব দিক থেকেই এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। সরাসরি যুদ্ধ বা সম্মুখ সমরে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রশ্নাতীত।
তবে একটি বিশেষ দিকে এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে, আর তা হলো তাদের আধাসামরিক বাহিনী । তারা নিয়মিত সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি কাজ করে এবং প্রচলিত যুদ্ধের কৌশলের বদলে অসম ও অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে থাকে।
লাতিন আমেরিকাজুড়ে আধাসামরিক বাহিনী
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে আধাসামরিক ও অনিয়মিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের রিপোর্ট অনুযায়ী, কিউবায় বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম আধাসামরিক বাহিনী রয়েছে যার সদস্য সংখ্যা ১১ লাখের বেশি। ভেনেজুয়েলায় 'কোলেক্তিভোস' নামক সরকারপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে যারা মাদুরো সরকারের সময় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে কাজ করেছে।
কলম্বিয়ায় আশির দশকে বামপন্থী বিদ্রোহীদের দমনে ডানপন্থী আধাসামরিক গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। মেক্সিকোতে শক্তিশালী ড্রাগ কার্টেলগুলো বর্তমানে কার্যত আধাসামরিক বাহিনীর মতো কাজ করছে, যাদের কাছে অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে।
লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপের ইতিহাস
গত দুই শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্র বারবার লাতিন আমেরিকায় হস্তক্ষেপ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে 'ব্যানানা ওয়ার্স'-এর সময় মার্কিন করপোরেট স্বার্থ রক্ষায় সেন্ট্রাল আমেরিকায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল।
শীতল যুদ্ধের সময় সিআইএ’র মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার উৎখাতের একাধিক অভিযানে অর্থায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের আমলে পানামা ছিল লাতিন আমেরিকার একমাত্র দেশ যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আনুষ্ঠানিক আক্রমণ চালিয়েছিল। ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ নামেই সেই অভিযানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।