দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় আঘাত হেনেছে অত্যন্ত শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে এর একটির মাত্রা ছিলো সাত দশমিক দুই এবং অন্যটির সাত দশমিক পাঁচ। মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে পরপর এই দুটি শক্তিশালী কম্পনে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ। ভূমিকম্পের তীব্রতায় রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরের বহু ভবন ধসে পড়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর রয়টার্সের।
ভেনিজুয়েলার অন্তবর্তী রাষ্ট্রপতি দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩২ জন নিহত এবং প্রায় ৭০০ জন আহত হয়েছেন। এ সম্পর্কিত আরও তথ্য পেলে জানাবো।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে ভেনিজুয়েলার স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোর)। এর উৎপত্তিস্থল ছিল কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে কারিবীয় উপকূলীয় অঞ্চলের মোরন এলাকার কাছাকাছি। প্রথম কম্পনের এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে প্রায় একই এলাকায় সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী মূল ভূকম্পন অনুভূত হয়। দেশটির ১০০ বছরের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
ভূমিকম্পের পর প্রাথমিকভাবে ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা তুলে নেওয়া হয়।
১০ হাজার ছাড়াতে পারে প্রাণহানি: ইউএসজিএস
ইউএসজিএস তাদের স্বয়ংক্রিয় ‘পেজার’ মডেলিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটির মডেলিং অনুযায়ী, এই দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
হালনাগাদ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা এক হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে থাকার সম্ভাবনা ৩৯ শতাংশ। আর ১০ হাজার থেকে এক লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে ৩৭ শতাংশ। এছাড়া এই দুর্যোগের কারণে ভেনিজুয়েলার মোট জিডিপির এক থেকে চার শতাংশ সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
তবে ভেনিজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সুনির্দিষ্ট মোট হতাহতের সংখ্যা জানানো হয়নি। রাজধানী কারাকাসে প্রাথমিকভাবে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলার সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কারাকাসে বিপর্যয়, জারি জরুরি অবস্থা
ভূমিকম্পের পরপরই ভেনিজুয়েলাজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, রাজধানী কারাকাসের আলতামিরাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ভবন ও ঘরবাড়ি ধসে পড়ার মতো ‘উদ্বেগজনক পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে। আফটারশক বা পরবর্তী কম্পনের আশঙ্কায় তিনি সাধারণ মানুষকে ঘরের বাইরে খোলা জায়গায় থাকার আহবান জানিয়েছেন।
ভূমিকম্পের তীব্রতায় রাজধানীর সিমোন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং দেশজুড়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অনেক পরিবার তাদের স্বজনদের খোঁজ না পেয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
সাহায্যের আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের
এদিকে এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ভেনিজুয়েলাকে জরুরি মানবিক ও উদ্ধারকাজে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউস থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এই দুর্যোগে ‘ভয়াবহ সংখ্যক’ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করতে তারা ইতিমধ্যে একটি দুর্যোগ সহায়তা দল এবং বিশেষ টাস্কফোর্স মোতায়েন করেছে। ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাসামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।
তেল স্থাপনাগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি
ভেনেজুয়েলার তেল পরিকাঠামো তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না, কারণ যেসব শহরে গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির সরকারি প্রতিবেদন রয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিকাঠামো অন্তর্ভুক্ত নেই।
মারাকাইবো হ্রদের নিকটবর্তী বিশাল তেল কেন্দ্রের কাছের মারাকাইবোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভেনিজুয়েলার কাছে বিশ্বের বৃহত্তম আনুমানিক তেলের মজুদ রয়েছে, কিন্তু কয়েক দশকের অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের অভাব এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে এর অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।
দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী অনেক জ্বালানি সংস্থা তেলক্ষেত্র, প্ল্যান্ট এবং শোধনাগারগুলোর অবস্থা সম্পর্কে প্রাথমিক মূল্যায়ন করার আগেই তাদের কর্মীদের হিসাব নিচ্ছিলো।
একটি সূত্র উল্লেখ করেছে যে, পরিষেবা পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। ভেনিজুয়েলার তেল মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা পিডিভিএসএ এবং এর প্রধান বিদেশী অংশীদার শেভরন মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো উত্তর দেয়নি।
যুক্তরাজ্যের তেল সংস্থা শেল জানিয়েছে, দেশে তাদের সমস্ত কর্মীর খোঁজ পাওয়া গেছে এবং কেউ আহত হয়নি।