দীর্ঘদিনের মানসিক সংকট, কাঠামোগত নানা সমস্যা এবং খাবারের চরম অভাবের মুখে অবশেষে পশ্চিম এশিয়া থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে মার্কিন সামরিক শক্তির অন্যতম প্রতীক পারমাণবিকচালিত বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন সেনা ও নাবিক নিয়ে রণতরীটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ফিরে যাচ্ছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, প্রায় ৫,০০০ নাবিক ও মেরিন সেনা বহনকারী এই রণতরীটি আরব সাগরে 'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন' পৌঁছানোর পর বৃহস্পতিবার নিজ দেশের উদ্দেশে রওনা দেয়। এদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আগেই এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়ার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ওই অঞ্চলে নতুন রণতরীর পরিচালনার ছবি প্রকাশ করে দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
তেহরতানভিত্তিক পার্সটুডে বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে রণতরীটিকে টানা প্রায় ৯ মাসেরও বেশি সময় সমুদ্রে অবস্থান করতে হয়েছে। এমনকি টানা ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে নাবিকরা কোনো বন্দরে নামার বা বিশ্রামের সুযোগ পাননি, যা মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ ও কঠিন একটি মোতায়েন।
এই দীর্ঘ অবস্থান ও চরম পরিস্থিতির কারণে রণতরীটির ভেতরে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়। মার্কিন সামরিক পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপে ভারসাম্য হারিয়ে একাধিক নাবিক সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। সেনাদের পরিবারগুলো কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে।
মার্কিন আইনপ্রণেতারা রণতরীটির ভেতরের শোচনীয় পরিবেশ তুলে ধরে জানান, জাহাজটিতে দীর্ঘ দিন গরম পানি ছিল না, বাথরুম ও শাওয়ারগুলো ভেঙে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, এবং সাবান ও টুথপেস্টের মতো জরুরি পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীর তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। সবচেয়ে সংকট তৈরি হয় খাবার নিয়ে—পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে পড়েছিল যে সেনাদের প্রতিদিন মাত্র আধা কাপ ভাত আর দুটি পাতলা রুটি খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের প্রতিরক্ষামূলক হামলায় বাহরাইনে থাকা প্রধান মার্কিন লজিস্টিক কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই সরবরাহের সংকট তৈরি হয়। ফলে মার্কিন বাহিনীকে প্রায় ২,১০০ মাইল দূরের একটি দ্বীপ থেকে রসদ পাঠাতে হচ্ছিল, যা শেষ পর্যন্ত প্রায় ভেঙে পড়ে।
যদিও মার্কিন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতির গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, তবে নাবিকদের চরম মানসিক বিপর্যয় ও সংসদ সদস্যদের আন্দোলনের পর যেভাবে এই রণতরীটিকে সরিয়ে নেওয়া হলো, তা মার্কিন সামরিক অভিযানের বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাকেই সামনে নিয়ে এলো।