নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫০ জনে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন তিন হাজার ৪৪ জন। রোববার দুর্যোগের পর পঞ্চম দিনে এসেও থামেনি উদ্ধার অভিযান, মিলছে মরদেহ। তবে বৈরী আবহাওয়া, নতুন করে নদীর পানি বৃদ্ধি এবং আরও ভূমিধসের আশঙ্কায় বারবার ব্যাহত হচ্ছে উদ্ধারকাজ।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৭৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ দুই হাজার ৪৯৮ জন।
অন্যদিকে, চীনের তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৪৬ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে দুই অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা ৭৫০ এবং নিখোঁজ তিন হাজার ৪৪ জন।
নেপালে নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন বিভিন্ন দেশের নাগরিক, পর্যটক, নিরাপত্তাকর্মী এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শত শত কর্মী। নিখোঁজদের মধ্যে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মী এবং ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে থাকা ১২৭ জন নেপালিও রয়েছেন।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর নেপালজুড়ে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় প্রায় ২০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আট হাজার ১৮৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া ২৭৯ জনসহ ২২৭ বিদেশি নাগরিককে।
তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া উদ্ধার অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন করে বৃষ্টিপাতের কারণে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর পানি বাড়ছে। চীনা কর্তৃপক্ষও উজান থেকে পানির প্রবাহ বাড়ার সতর্কতা দিয়েছে। ফলে নেপালের কয়েকটি এলাকায় বাসিন্দাদের উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নদীর তীরবর্তী ও পাহাড়ি এলাকায়। বুধবার হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বিশাল কাদা-পাথরের প্রবাহ নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি হ্রদের মতো জলাধার তৈরি করে। পরে সেই পানি নদীতে প্রবাহিত হয়ে ব্যাপক বন্যা সৃষ্টি করে। এখনো নতুন করে ভূমিধস ও জলাধার তৈরির আশঙ্কা থাকায় উদ্ধারকর্মীদেরও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হচ্ছে।
চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে নিখোঁজ ৫৪৬ জনের মধ্যে ২৩ দেশের নাগরিক রয়েছেন। নিখোঁজ বিদেশিদের তালিকায় ১০৪ জন নেপালি, ৪৯ জন ভারতীয়, ৩৩ জন লাটভিয়ান, ১৮ জন মার্কিন এবং ১৫ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। নিখোঁজ বিদেশিদের পরিচয় শনাক্ত ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে নেপাল ও চীন সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
নেপালের দুর্গত এলাকায় শত শত মানুষ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে বিশেষায়িত টানেল উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভারত থেকে ১১ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল টানেল উদ্ধারে সহায়তা করছে এবং চীন থেকেও বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হয়েছে। নিখোঁজদের শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা, ফরেনসিক প্রযুক্তি এবং মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থার জন্যও সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
দুর্যোগের ব্যাপকতায় নেপালের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সেতু, ঘরবাড়ি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঠমান্ডুর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ প্রিথভী মহাসড়কের বেশ কিছু অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
নেপাল সরকার জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। রাশুয়া ও নুওয়াকোটে নগদ সহায়তা পাঠানো হয়েছে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ট্রাক ও হেলিকপ্টারও পাঠানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ত্রাণ ও বিশেষায়িত উদ্ধার সহায়তা এসেছে।
এদিকে এই ভয়াবহ দুর্যোগের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতার সঙ্গে এই বিপর্যয়ের যোগসূত্র রয়েছে। হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে বা ধসে আকস্মিক জলাধার তৈরি হয়ে তা ভেঙে পড়লে মুহূর্তেই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সৃষ্টি হতে পারে।
রেডক্রসের হিসাবে, নেপাল ও তিব্বতের এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও পাথরের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সবচেয়ে বড় শঙ্কা এখন নতুন করে বন্যা ও ভূমিধস। নদীর পানি বাড়তে থাকায় দুর্গত এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একদিকে নিখোঁজ হাজারো মানুষের সন্ধানে অভিযান, অন্যদিকে নতুন বন্যার আশঙ্কা—দুই সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নেপাল ও তিব্বতের উদ্ধারকর্মীদের।