ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার দখল নিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। লোহিত সাগরের তীরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশটির পশ্চিম উপকূলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করলো গোষ্ঠীটি।
বৃহস্পতিবার মোখা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা জানায় হুথিরা। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী শহর থেকে সরে যাওয়ার পর সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তারা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনজন ইয়েমেনি সরকারি কর্মকর্তা মোখা দখলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে ইয়েমেন সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
কাতারভিত্তিক আলজাজিরা জানায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে পশ্চিম তাইজ, দক্ষিণ হোদেইদাহ ও মোখা—তিন দিক থেকে অভিযান জোরদার করে হুথিরা। মোখার উপকণ্ঠে তীব্র লড়াইয়ের পর ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের সদস্যরা সরে গেলে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয় হুথিরা।
ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত মোখা। শহরটি বাব আল-মান্দাব প্রণালী থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার উত্তরে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা এই প্রণালী বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামরিক কৌশলের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোখা দখলের পর হুথিরা কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকেও তৎপরতা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সরকারি বাহিনী হোদেইদাহর আল-তুহাইতা, আল-সালিফ ও কামারান দ্বীপে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। জবাবে জুকার দ্বীপ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার খবরও এসেছে।
আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতে তাইজ ও হোদেইদাহ প্রদেশে গত দুই সপ্তাহে ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মোখা দখলের পর শত শত নারী ও শিশু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য লাহিজ ও এডেনের দিকে চলে গেছে।
তবে মোখার গুরুত্ব শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধের মাঠে সীমাবদ্ধ নয়। শহরটির অবস্থান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি।
রয়টার্সের হিসাবে, বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের প্রায় ৭ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এশিয়া থেকে ইউরোপে সুয়েজ খাল হয়ে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালী।
২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের হামলার কারণে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে অনেক জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ বিকল্প পথে চলতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময়—দুটিই বেড়ে যায়।
এখন মোখায় হুথিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে লোহিত সাগরের নৌনিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী ও তাদের সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘাত কিছুটা কমলেও রাজনৈতিক সমাধান এখনও অধরা। মোখার মতো কৌশলগত শহরের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন সেই সামরিক ভারসাম্যকে নতুন করে নাড়া দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোখা দখল হুথিদের জন্য শুধু একটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া নয়; লোহিত সাগরের উপকূলে তাদের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত। এর প্রভাব পড়তে পারে ইয়েমেনের চলমান সংঘাতের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে।