ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান, সামরিক ঘাঁটি ও কূটনৈতিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তদারকি সংস্থার প্রতিবেদনে।
পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইরান যুদ্ধের কারণে মার্কিন প্রাণহানি, সরকারি অর্থের ব্যয় এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। এতে মার্কিন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দপ্তর এবং ইউএসএআইডির তদারকি সংস্থার তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ফলে অত্যাধুনিক অস্ত্রের কৌশলগত মজুতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গোলাবারুদ পুনরায় সরবরাহের ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক শিল্পের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষামূলক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে।
এতদিন গোলাবারুদের ঘাটতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশের পরও পেন্টাগন তা অস্বীকার করে আসছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে যেকোনো সংঘাতে লড়াই করার মতো প্রয়োজনীয় অস্ত্র রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছিল।
এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরি করছে।
মার্কিন ঘাঁটিতে শত শত স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত
এপি জানায়, ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির শত শত ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস ঘাঁটিও ইরানি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। ফলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডকে অনেক দূরের বিকল্প কেন্দ্র থেকে রসদ সরবরাহ করতে হয়েছে। এর মধ্যে ভারত মহাসাগরের একটি দ্বীপে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়াও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম সচল রাখতে ১৪ থেকে ১৮ দিনের লজিস্টিকস চক্রের প্রয়োজন হয়েছে।
ড্রোন ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানে ক্ষতি
ইরানের হামলায় সর্বোচ্চ ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। প্রতিটি ড্রোনের মূল্য প্রায় তিন কোটি ডলার।
এছাড়া সাতটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবে মাটিতে থাকা পাঁচটি বিমান ইরানি অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইরাকের আকাশে একটি কেসি-১৩৫ অন্য একটি কেসি-১৩৫-এর সঙ্গে সংঘর্ষের পর বিধ্বস্ত হয়। এতে ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন। আরব সাগরে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে একজন পাইলটও নিহত হন। এসব মৃত্যুকে অ-শত্রুতামূলক ঘটনা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে কুয়েত, ইরাক, জর্ডান ও সৌদি আরবে আরও ১১ জন মার্কিন সেনাকে যুদ্ধে নিহত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
যুদ্ধে ব্যয় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জুলাইয়ের শেষ দিকে কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, ইরান যুদ্ধে তখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
ইরানের হামলায় ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ডলার।
এছাড়া সংঘাত মোকাবিলায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অন্যান্য ব্যয় হয়েছে ১১৩ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে জরুরি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং মার্কিন কর্মকর্তা, তাদের পরিবারের সদস্যসহ অন্যান্য মার্কিন নাগরিক ও যোগ্য তৃতীয় দেশের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার কাজে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৯ হাজার মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হয়। জুনের শেষ পর্যন্ত এই উদ্ধার কার্যক্রমে পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যয় হয়েছে ১১ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
এদিকে ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরুরি ও অ-জরুরি সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে। এর বড় অংশ গেছে সৌদি আরবে। এসব বিক্রির মধ্যে সামরিক হেলিকপ্টার, গোলাবারুদ, গোলাবারুদ সহায়তা এবং অত্যাধুনিক নির্ভুল অস্ত্র ব্যবস্থাও ছিল।