অপ্রতিসম বা ‘মিরর ইমেজ’ (আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবির মতো) অণুর দীর্ঘদিনের এক জটিল রহস্য সমাধানে ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন ফরাসি রসায়নবিদ অঁরি কাগান ও জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই।
ওষুধ তৈরির গবেষণায় এই আবিষ্কার অত্যন্ত যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে বলে বুধবার (৭ অক্টোবর) মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থা নোবেল অ্যাসেম্বলির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বিজয়ী গবেষকদের মধ্যে কেনসো সোয়াইয়ের বয়স ৭৬ বছর এবং অঁরি কাগানের বয়স ৯৫ বছর। তাদের এই সাফল্য মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসি রসায়নবিদ লুই পাস্তুরের মৌলিক আবিষ্কারের ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে।
পুরস্কার ঘোষণার পর নোবেল কমিটির সাংবাদিক সম্মেলনে টেলিফোনে যুক্ত হয়ে প্রতিক্রিয়া জানান বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। তিনি অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, এটি আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দঘন দিন। অধ্যাপক অঁরি কাগানের সঙ্গে এই পুরস্কার ভাগ করে নিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও সম্মানিতবোধ করছি। তিনি আরও জানান, যখন সুইডেন থেকে ঐতিহাসিক এই জয়ের খবরটি আসে, তখন তিনি দৈনন্দিন কেনাকাটার কাজে বাইরে ছিলেন।
অন্যদিকে, সংবাদিক সম্মেলনে নোবেল কমিটি কাগানকে ফোনের মাধ্যমে বিজয়ের সুখবরটি পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো।
প্রতিবছরের ন্যায় ঐতিহ্য বজায় রেখে চলতি নোবেল সপ্তাহে এটি ছিলো ঘোষিত তৃতীয় পুরস্কার। এর আগে চলতি সপ্তাহের গত সোমবার চিকিৎসাশাস্ত্রে এবং মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য মনোনীত বিজ্ঞানীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
‘ডান-হাতি’ ও ‘বাম-হাতি’ অণুর সমীকরণ
বিজ্ঞানের আলোয় মানবজীবন ও প্রকৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য অসংখ্য অণু মূলত দুটি ভিন্ন রূপে বিদ্যমান থাকে। এই রূপ দুটি একটি অপরটির আয়নায় তৈরি প্রতিচ্ছবির মতো—ঠিক যেন মানুষের বাম ও ডান হাতের গঠন। আমাদের দুটি হাত দেখতে এক মনে হলেও একটির ওপর অন্যটি হুবহু বসানো যায় না।
প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়মে জীবদেহ ও মানব শরীর প্রায় একচেটিয়াভাবে এসব অণুর কেবল একটি রূপই গ্রহণ ও ব্যবহার করে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হোমোচিরালিটি’ বলা হয়, যার নামকরণ হয়েছে একটি গ্রিক শব্দ থেকে। গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অণুর এই রহস্যময় আচরণ রসায়নবিদদের চরম ভাবনায় ফেলে রেখেছিলো।
চলতি বছরে রসায়নে প্রদত্ত এই নোবেল পুরস্কারটি মূলত এমন সব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিলো, যা রসায়নাগারে নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোকে অণুর একটি সুনির্দিষ্ট ‘মিরর ইমেজ’ বা কাঙ্ক্ষিত রূপের দিকে চালিত করার নিখুঁত পথ দেখিয়েছে। ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর রাসায়নিক বিক্রিয়া নকশা করার ক্ষেত্রে এই কৌশল বৈজ্ঞানিক জগতে এক অভাবনীয় বিপ্লব নিয়ে এসেছে।
রসায়নে নোবেল কমিটির প্রভাবশালী সদস্য পিটার সোমফাই এই গবেষণার বাস্তব গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, যেকোনো ওষুধের উপাদান অণুর ‘বাম-হাতি’ রূপটি মানবদেহে যে প্রতিক্রিয়া বা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটির ‘ডান-হাতি’ রূপটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে জনস্বাস্থ্যের জন্য ওষুধ প্রক্রিয়াকরণে অণুর সঠিক রূপটিকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তুত করার নির্ভুল পদ্ধতির প্রয়োজন তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের জটিলতা নিরসনে ও কার্যকরী পদ্ধতি উদ্ভাবনে এবারের নোবেল বিজয়ীদের গবেষণালব্ধ ফলাফল ও দিকনির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর সমাধানে অত্যন্ত শক্তিশালী সব হাতিয়ার ও কৌশল উপহার দিয়েছেন।
লুই পাস্তুরের অসমাপ্ত কাজের অগ্রগতি
অণুর এই রূপভেদ সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিলো লুই পাস্তুরের কাজের হাত ধরে; যিনি নোবেল পুরস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবর্তিত হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
তৎকালীন সময়ে পাস্তুর মূলতঃ ওয়াইন বা আঙুর-মদ তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান ‘টারটারিক অ্যাসিড’ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেন যে, বিশেষ ব্যাকটেরিয়া টারটারিক অ্যাসিডের দুটি অণু-রূপের মধ্যে কেবল একটি নির্দিষ্ট রূপের—অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে টাটকা আঙুরে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় এমন রূপটিরই কেবল গাঁজন ঘটাতে পারে। আর ল্যাবরেটরিতে তৈরি অন্য রূপটির ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া কোনো রকম গাঁজন প্রক্রিয়া ঘটায় না।
পাস্তুরের এই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ প্রথম প্রমাণ করে দেয় যে, প্রকৃতিতে একই রাসায়নিক পদার্থ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ও ধর্মে বিদ্যমান থাকতে পারে। শুধু তা-ই নয়, অনেক সময় অণুর একটি রূপ মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত নিরাময়কারী হলেও অন্য রূপটি আবার স্বাস্থ্যের জন্য বিষাক্ত বা মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
পরবর্তীতে কাইরাল পদার্থের সঠিক ও কাঙ্ক্ষিত রূপটি ল্যাবরেটরিতে কীভাবে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব—সেই জটিল সমীকরণের সহজ সমাধান মেলান কাগান ও সোয়াই। তারা রাসায়নিক গবেষণাগারে এমন এক বিশেষ ধরনের অপ্রতিসম বিক্রিয়া সফলভাবে ঘটাতে সমর্থ হন, যা সরাসরি একটি নির্দিষ্ট রূপের অণুর আধিক্য তৈরি করে।
এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারটির গুরুত্ব কতোটা গভীর, তা বোঝা যায় ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ‘থ্যালিডোমাইড কেলেঙ্কারী’র ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে। সে সময় সন্তানসম্ভবা মায়েদের সেবনের জন্য ‘থ্যালিডোমাইড’ নামক একটি ঘুমের ওষুধ বা শান্তিদায়ক (সিডেটিভ) ওষুধ বাজারজাত করা হয়েছিলো। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার শিশু হাত-পা ছাড়া বা জন্মগত হাড়ের বিকলাঙ্গতা ও মারাত্মক ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
বিজ্ঞানীরা যখন এই মানবিক বিপর্যয়ের মূল কারণ বিশ্লেষণ করতে বসেন, তখন তারা দেখতে পান যে ওই ওষুধের মূল সক্রিয় উপাদানটির ‘মিরর ইমেজ’ সদৃশ অনাকাঙ্ক্ষিত রূপটিই ছিল শিশুদের এমন ভয়াবহ শারীরিক ক্ষতির আসল কারণ। কাগান ও সোয়াইয়ের আবিষ্কারের ফলে ভবিষ্যতে ওষুধে এ জাতীয় ভুল হওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি কেটে গেছে।
সুইডিশ উদ্ভাবকের উইলের প্রবর্তিত স্মারক
সুইডেনের বিখ্যাত উদ্ভাবক ও শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালে করে যাওয়া উইলের ওপর ভিত্তি করে ১৯০১ সাল থেকে বিজ্ঞান, সাহিত্য ও বিশ্বশান্তির ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য নিয়মিত এই নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়ে আসছে। কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ও বৈশ্বিক সঙ্কটে এর ধারাবাহিকতায় মাঝে দু-একবার সাময়িক ছেদ পড়েছিলো।
পেশায় রসায়নবিদ আলফ্রেড নোবেল ঊনবিংশ শতাব্দীতে সামরিক ও নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন বিস্ফোরক—বিশেষ করে ‘ডিনামাইট’ উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। পরবর্তীতে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারটি তালিকার শেষে যুক্ত করা হয়, যার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করে আসছে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সেরিজেস রিক্সব্যাংক)।
বাস্তবতায় পদার্থবিজ্ঞান, সাহিত্য কিংবা শান্তি পুরস্কারের মতো তারকাখ্যাতি বা সাড়াজাগানো খবর হিসেবে রসায়নের নোবেল অনেক সময় সাধারণ মানুষের আলোচনায় কিছুটা কম ঠাঁই পেলেও বিজ্ঞানের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে—পারমাণবিক বিভাজন (নিউক্লিয়ার ফিশন) এবং আধুনিক জিন প্রযুক্তির ‘জেনেটিক সিকোয়েন্সিং’ কৌশলের মতো মানবসভ্যতা বদলে দেওয়া একাধিক প্রভাবশালী আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিয়েছে রসায়নের এই প্ল্যাটফর্ম।
এর আগে গত বছর (২০২৫) রসায়নে মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারটি পেয়েছিলেন বিজ্ঞানী সুসুমু কিতাগাওয়া, রিচার্ড রবসন এবং ওমর ইয়াঘি। তারা যৌথভাবে ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক’ (MOFs) নামের এক বিশেষ ধরণের আণবিক খাঁচা বা কাঠামো উদ্ভাবন করেছিলেন; যা বায়ুমণ্ডলের জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশুদ্ধ সুপেয় পানির সঙ্কট মোকাবিলার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সামলাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের প্রয়াণদিবস ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে বিজয়ী বিজ্ঞানীদের হাতে এই পুরস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হবে। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজীয়দের হাতে পদক তুলে দেবেন সুইডেনের রাজা ষোড়শ কার্ল গুস্তাভ। সম্মানজনক পদক প্রদানের পর ঐতিহাসিক স্টকহোম সিটি হলে বিজয়ীদের সম্মানে আয়োজিত হয় ঐতিহ্যবাহী এক রাজকীয় ভোজসভা।
বিজয়ী বিজ্ঞানীরা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এই সম্মাননা ও পদকের পাশাপাশি নগদ অর্থ হিসেবে এক কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (যা বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ) লাভ করবেন, যা তাদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হবে।
নোবেল ঐতিহ্যের নিয়ম অনুযায়ী, সব নোবেল ক্যাটাগরির পুরস্কার সুইডেনের স্টকহোমে দেওয়া হলেও কেবল মাত্র বিশ্বশান্তির নোবেল পুরস্কারটি আলাদা নরওয়ের রাজধানী অসলোতে আয়োজিত আয়োজনের মাধ্যমে প্রদান করা হয়।