সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুইজন বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতির বরাতে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা বিবিসি জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুইজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিশরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। হামলার পর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং বহু ফ্লাইট বাতিল ও অন্যত্র ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
সৌদি-নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট এই রক্তক্ষয়ী হামলার কড়া জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তারা ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের এই হামলার জন্য দায়ী করে একে ‘পুরোদস্তুর যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
সর্বশেষ এই হামলার বিষয়ে হুথিরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য না করলেও, এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরে চালানো আলাদা হামলায় দায় স্বীকার করেছিলে। ওই হামলায় একজন পাইলটসহ তিনজন নিহত ও একটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী এবং দেশটির অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারী হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সম্প্রতি সংঘাত নতুন করে তীব্র রূপ ধারণ করেছে। সংঘাতের এই দফায় ২০১৫ সালের মে মাসের পর থেকে সৌদি আরবে শনিবারের এই হামলাটিকেই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সৌদি জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রিয়াদের পাশাপাশি একই দিনে পূর্ব সৌদি আরবের দাম্মামে অবস্থিত কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও একটি প্রজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলা) আঘাত হানে।
শনিবারের বিবৃতিতে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বর্তমানে বিমানবন্দরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার সময় অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে অবস্থানরত এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি ৪০১ নম্বর গেটে সরাসরি আঘাত হানতে দেখেন। চোখের সামনে একাধিক মানুষকে রক্তাত ও আহত হতে দেখে টার্মিনালের ভেতরে আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে জানায়, ঘটনার পরপরই এক ডজনেরও বেশি অ্যাম্বুলেন্সকে দ্রুত বিমানবন্দরের টার্মিনালের দিকে ছুটতে দেখা গেছে।
সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, যাত্রীবাহী টার্মিনালে হামলাটি চালানোয় সাধারণ বেসামরিক যাত্রী ও বিমানবন্দরের কর্মীরা হতাহত হয়েছেন।
এদিকে সৌদি আরবের ওপর বেসামরিক স্থাপনায় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। হামলায় একজন মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার তথ্যও নিশ্চিত করেছেন তিনি।
পরবর্তীতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হুথিদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে আলোচনা চলছে। ট্রাম্প বলেন, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। আমরা মাত্রই সাম্প্রতিক হামলার খবর পেয়েছি, তাই এ বিষয়ে দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ ঘটনায় গভীর মর্মাহত প্রকাশ করে একে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন এবং অবিলম্বে সব ধরনের হামলা বন্ধের আহবান জানান। মিশর, ফিলিস্তিন ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশও এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। হামলার পর সৌদি আরবে অবস্থিত পশ্চিমা দূতাবাসগুলো তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দর এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের নাগরিকদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই এলাকা এড়িয়ে চলার বার্তা দিয়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় কুয়েত এয়ারওয়েজসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক বিমান সংস্থা রিয়াদগামী ও রিয়াদ থেকে বহির্গামী সব ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করেছে। এভিয়েশন ট্র্যাকিং সাইট ‘ফ্লাইটরাডার’-এর তথ্যমতে, রিয়াদগামী বহু ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হুথি বিদ্রোহীদের দাবি, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরকারি বাহিনীকে আকাশ ও স্থলপথে সহায়তা করার কারণেই তারা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে কৌশলগত অবকাঠামো ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
সম্প্রতি লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো দখল করে নিতে হুথিরা জোর তৎপরতা শুরু করার পর এই সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। এর মধ্যে বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কাছে মোখা বন্দর সংলগ্ন এলাকা অন্যতম। তবে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী পরবর্তীতে দাবি করে যে, তারা ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এবং হুথিদের প্রতিহত করতে ২০১৫ সালে গঠিত হয় সৌদি-নেতৃত্বাধীন আরব জোট। বহু বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং অঞ্চলে মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়। ২০২২ সালে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও তা ভেঙে পড়ে। হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধের’ ঘোষণা দিয়ে লোহিত সাগরে এবং সৌদি মূল ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করে।