ইসরাইলের সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাডি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এছাড়া আরব দলগুলো ১৯টি আসন পাওয়ার পথে রয়েছে।
দেশটির গণমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের আগে নতুন কোনো বড়ো আপডেট আসার সম্ভাবনা নেই, কারণ কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন এখন ‘ডাবল এনভেলপ’ ব্যালট এবং বিশেষ নজরদারির প্রয়োজন এমন সাধারণ ব্যালটগুলো গণনার দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বুধবার বিকেলে জানিয়েছে, ৮৯.৮ শতাংশ ভোট গণনার পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ১২০ সদস্যের নেসেটে (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) ৫৩টি আসন পাওয়ার পথে রয়েছে। অন্যদিকে, ‘ইয়াশার’ পার্টির প্রধান গাডি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮টি আসন পেতে পারে। অর্থাৎ, কোনো জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছাতে পারেনি।
মূলত আরবদের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দল সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পাওয়ার পথে রয়েছে, যা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এর ফলে তারা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক বা ‘কিংমেকার’ অবস্থানে চলে আসতে পারে। মঙ্গলবারের নির্বাচনে আরব ভোটাররা রেকর্ড সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন, যার লক্ষ্য ছিলো নেতানিয়াহু ও তার কট্টর ডানপন্থি মিত্রদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া। এর আগে আরব দলগুলোর সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা ছিল ১৫টি।
বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা নির্বাচনের আগের কয়েক সপ্তাহ বা মাসজুড়ে হওয়া অধিকাংশ মূলধারার জনমত জরিপের ফলাফলের চেয়ে ভিন্ন। ওই জরিপগুলোতে প্রায় সবক্ষেত্রেই নেতানিয়াহুর জোটের চেয়ে আইজেনকোটের জোটকে এগিয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিলো—যদিও সেখানেও কোনো পক্ষেরই এককভাবে জোট সরকার গঠনের মতো স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো না।
মঙ্গলবার রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন বড়ো সম্প্রচার মাধ্যম যে ‘এক্সিট পোল’ প্রকাশ করেছিলো, তার সঙ্গেও বর্তমান ফলাফলের বড়ো পার্থক্য রয়েছে। ওই জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর জোটের চেয়ে আইজেনকোটের জোট দুই বা তিনটি আসনে এগিয়ে ছিলো। তবে রাতভর এবং বুধবার বিকেল পর্যন্ত ভোট গণনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় যে, এক্সিট পোলগুলোর পূর্বাভাস সঠিক ছিলো না; বরং নেতানিয়াহুর দল ও তার জোট আইজেনকোটের জোটকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছে।
বুধবার রাত ৯টার পরপরই দেওয়া এক আপডেটে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন জানায় যে, মোট ভোটের ৮৯.৮ শতাংশ গণনা করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় সব সাধারণ ব্যালট বাক্সের ফলাফল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও এই ফলাফল চূড়ান্ত নয়, তবে এতে বড়ো ধরনের কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। এক বিবৃতিতে সিইসি জানিয়েছেন যে, অবশিষ্ট সাধারণ ব্যালটগুলো গণনার ক্ষেত্রে বাড়তি তদারকির প্রয়োজন হবে, যার ফলে ফলাফল ঘোষণায় কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। এছাড়া, প্রায় চার লাখ ৩০ হাজার থেকে চার লাখ ৮০ হাজার ‘ডাবল এনভেলপ’ ভোট এখনও গণনা করা বাকি রয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর থেকে এই ভোট গণনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যেই তা সম্পন্ন হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘ডাবল এনভেলপ’ ভোটের এই সংখ্যাটি প্রাথমিক একটি প্রাক্কলন মাত্র, কারণ কর্মকর্তারা এখনও ব্যালটগুলো গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই ব্যালটগুলো মূলত সেনা সদস্য, কারাবন্দি ব্যক্তি, বিদেশে কর্মরত কূটনীতিক এবং যারা নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেননি, তাদের দেওয়া। প্রতিটি ভোটার অন্য কোথাও ভোট দিয়েছেন কি না, তা যাচাই করার প্রয়োজন থাকায় বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই ভোটগুলো গণনা করা হয়নি; এগুলো আলাদাভাবে গণনা করা হবে।
তাই, ভোটের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক ফলাফল আগামী চার নভেম্বর প্রকাশিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নেসেট (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট)-এর প্রতিটি আসনের জন্য প্রায় ৪০ হাজার ভোটের প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে, অনুপস্থিত ভোটারদের এই ব্যালটগুলো চূড়ান্ত রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই ভোটগুলো মূল ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
এদিকে ইতিমধ্যে একটি বিভক্ত দেশের চিত্র ফুটে উঠছে। নেতানিয়াহুর জোট কিংবা আইজেনকোটের জোট—কারও পক্ষেই স্পষ্ট জয় পাওয়া সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি বদলাতে হলে তাদের একে অপরের সঙ্গে অথবা আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধার প্রয়োজন হতে পারে।
স্থানীয় সময় দুপুর দুইটা ৩২ মিনিটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ১২০টি আসনের মধ্যে ২৬টি আসন পেয়ে নেতানিয়াহুর ‘লিকুদ’ দল সবচেয়ে বড়ো অবস্থানে রয়েছে। এর পরেই রয়েছে আইজেনকোটের ‘ইয়াশার’ দল, যারা পেয়েছে ২১টি আসন।
নাফতালি বেনেটের ‘বি’ইয়াচাদ’ দল এবং ইউসেফ জাবারিনের ‘জয়েন্ট লিস্ট’—উভয়ই ১২টি করে আসন পেয়েছে। এছাড়া, বামপন্থী ‘ডেমোক্র্যাটস’ দল পেয়েছে আটটি আসন। চরম ডানপন্থি দল ‘ওতজমা ইহুদিৎ’ এবং অতি-অর্থোডক্স দল ‘শাস’ ও ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম’ —এই প্রতিটি দলের দখলে রয়েছে সাতটি করে আসন। একই সংখ্যক আসন পেয়েছেন মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ‘রা’আম’ এবং আভিগদোর লিবারম্যানের ‘ইসরাইল বেইতেনু’ দল।
১২০ আসনবিশিষ্ট নেসেট (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট)-এর বাকি আসনগুলোর মধ্যে ছয়টি পেয়েছে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিখের নেতৃত্বাধীন ‘রিলিজিয়াস জায়োনিজম’ দল।
এর ফলে ইয়োয়ায হেন্ডেলের ‘রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক’ দলটি ৩.২৫ শতাংশের নির্বাচনী সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়েছে; তারা পেয়েছে ২.৬৩ শতাংশ ভোট। একইভাবে, ওফের উইন্টারের ‘পিপল অব ইসরায়েল’ দলটিও এই সীমা পার হতে পারেনি, তারা পেয়েছে মাত্র ১.৬১ শতাংশ ভোট। ‘হারেদি পাবলিক’ নামে একটি ছোট দল—যারা ইসরাইলের অতি-অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের সামনে একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিল—নির্বাচনী সীমা থেকে অনেক পিছিয়ে মাত্র ০.১৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
বাস্তবিক অর্থে, দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টনের পর নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট—যার অন্তর্ভুক্ত দলগুলো হলো লিকুদ, শাস, ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম, ওতজমা ইহুদিৎ এবং রিলিজিয়াস জায়োনিজম—মোট ৫৩টি আসন পেয়েছে। এটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের চেয়ে আটটি কম। বর্তমান নেসেটে এই জোটের হাতে ৬৮টি আসন রয়েছে, যা থেকে তাদের আসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অন্যদিকে, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট—যার মধ্যে রয়েছে ইয়াশার, বি’ইয়াচাদ, দ্য ডেমোক্র্যাটস এবং ইসরাইল বেইতেনু—সব মিলিয়ে ৪৮টি আসন পেয়েছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে ১৩টি কম।
আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো—‘জয়েন্ট লিস্ট’ এবং ‘রাআম’ —সর্বমোট ১৯টি আসন লাভ করেছে, যা এখন পর্যন্ত তাদের সর্বোচ্চ অর্জন এবং তাদের বর্তমান ১০টি আসনের প্রায় দ্বিগুণ। নেতানিয়াহু-বিরোধী জোটকে একটি সুবিধাজনক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য এটি যথেষ্ট হতো, যদি না ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’ বাদে জায়নবাদী জোটের অন্য সব দল ‘রাআম’ বা ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর সঙ্গে সহযোগিতা করার সম্ভাবনাকে আগেই নাকচ করে দিতো।