জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধি, পাবলিক সার্ভিসের অভাব এবং প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের বাজেট নীতির প্রতিবাদে ফ্রান্সে আবারও তীব্র গণবিক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন করে সম্ভাব্য সহিংসতা ও নৈরাজ্য রুখতে শনিবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সারাদেশে রেকর্ড ৭০ হাজার পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করেছে। এতে ফ্রান্সে থমকে গেছে কেনাকাটা, প্যারিসজুড়ে নেয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা।
হ্যালোইনের এই বিশেষ দিনে আয়োজিত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ এটিকে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দুই সপ্তাহ আগে ঘটে যাওয়া দাঙ্গা, ভাংচুর ও দোকানপাটে লুটপাটের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই হতে দেয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।
প্যারিসের ঐতিহাসিক রিপাবলিক ও বাস্তিল স্কয়ারের মধ্যকার পদযাত্রাটি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আন্দোলনকারীদের শুধু শহরের পূর্বাঞ্চলীয় বুলেভার্ডগুলোতে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রধান বাণিজ্যিক ও কেনাকাটার এলাকাগুলো নিরাপদ রাখা যায়। এছাড়াও আন্দোলনকারীরা যাতে হ্যালোউইনের মাস্ক ব্যবহার করে মুখ লুকাতে না পারে, সে লক্ষ্যে মুখ ঢেকে রাখা নিষিদ্ধ করার বিশেষ আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করছে পুলিশ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পুরো ফ্রান্সে প্রায় ১৫০টি স্থানে বিক্ষোভ ও সমাবেশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের এই যুবনির্ভর আন্দোলন ইতোমধ্যে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে; জার্মানির ৩০টিরও বেশি শহরে একই ধরণের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।
ফরাসি সরকারের শিক্ষা সংস্কার এবং জ্বালানি খরচ কমানোর আশ্বাস সত্ত্বেও আন্দোলন স্তিমিত হয়নি। ২০২৭ সালের জাতীয় বাজেট আলোচনার মধ্যে ম্যাক্রোঁর সংখ্যালঘু সরকার এখন চরম কোণঠাসা। দেশটির সরকারি ঋণ জিডিপির ১২০ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ায় ব্যয় সংকোচনের চাপে পড়েছে সরকার, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, অতিরিক্ত ভিড়যুক্ত শ্রেণীকক্ষ ও বৈষম্যমূলক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরাও এখন শ্রমিক ইউনিয়ন ও পুনরুজ্জীবিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা: টানা আন্দোলনে ফরাসি অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফ্রান্স চেম্বার অফ কমার্সের মতে, শুধু খুচরা বিক্রেতাদেরই ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি ইউরো ছাড়িয়েছে (যা অন্যান্য ক্ষতিসহ হিসাব করলে দ্বিগুণ হতে পারে)। হ্যালোউইন ও ক্রিসমাসের কেনাকাটার মৌসুমেও প্যারিসের বিলাসবহুল ব্র্যান্ড- যেমন হার্মিস, লুই ভিটোর দোকানে হামলা ও লুটপাটের আশঙ্কায় কাঠের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।
এই গণ-অসন্তোষের ফলে আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মারিন ল পেন রাজনীতিতে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে এসেছেন। আন্দোলন দমন করতে ফরাসি সরকার একটি বিতর্কিত আইন পাস করতে যাচ্ছে, যেখানে সহিংসতায় যুক্ত ব্যক্তি বা দলকে ১০,০০০ ইউরো পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হবে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এই আইন সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানোর অধিকারকে সংকুচিত করবে।