টেলিভিশনের রঙিন পর্দায় যিনি এতদিন অত্যন্ত প্রতাপের সাথে অপরাধীদের হাঁড়ি-হাঁড়ি খবর ফাঁস করতেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে 'মিশন ইম্পসিবল' সাজিয়ে নীল বাতি জ্বালাতেন, সেই গ্ল্যামারাস টিভি স্টার নিজেই এখন ফাঁসির মঞ্চের মুখোমুখি। মিশরের কায়রো জাজমেন্টাল কোর্ট দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও চাঞ্চল্যকর মাদক চোরাচালানের মামলায় জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপিকা সারা খলিফাসহ ১২ আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চূড়ান্ত রায় দিয়েছে।
শনিবার কায়রোর ফিফথ সেটেলমেন্ট কোর্ট কমপ্লেক্সে বিচারক প্যানেল এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামিদের প্রত্যেককে ৫ লাখ মিশরীয় পাউন্ড করে জরিমানা এবং লুণ্ঠিত অর্থ, স্বর্ণালংকার, গাড়ি ও বিলাসবহুল মোবাইল বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
মিশরের কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় স্থান 'গ্র্যান্ড মুফতি'-র কাছে চূড়ান্ত পরামর্শ ও সম্মতির জন্য ফাইল পাঠানোর পর সর্বসম্মতভাবে এই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রাখা হয়। গত ৪ আগস্ট প্রাথমিক সিদ্ধান্ত আসলেও মুফতির ধর্মীয় অনুমোদনের পর বিচারক এই চূড়ান্ত আদেশ দেন।
৩৯ বছর বয়সী সারা খলিফা মিশরীয় তারকা ফুটবলার মাহমুদ কাহরাবার সাবেক স্ত্রী এবং ইনস্টাগ্রামে প্রায় ২৫ লাখেরও বেশি অনুসারী থাকা অত্যন্ত প্রভাবশালী এক গ্ল্যামার কুইন।
টিভি সঞ্চালনার পাশাপাশি আঘৌজা এলাকায় তাঁর নিজস্ব একটি কসমোটিক সার্জারি ক্লিনিক এবং 'সারা প্রোডাকশন' নামে এক বিশাল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি রয়েছে। ২০২৪ সালেও জনপ্রিয় গায়ক হামো বিকার সাথে 'সারা অ্যান্ড বিকা' শো করে তিনি সংবাদের শিরোনাম হয়েছিলেন। তবে, রূপালী পর্দার এই আলো ঝলমলে জীবন মুহূর্তেই অন্ধকারে তলিয়ে যায় তাঁর অসাধু অপরাধ সাম্রাজ্যের পর্দা উন্মোচনের পর।
মিশরীয় রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও প্রসিকিউশনের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক রোমহর্ষক তথ্য। প্রায় ৪০ দিন ধরে গোপন গোয়েন্দা নজরদারির পর ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল কায়রো থেকে সারা খলিফাকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সারা খলিফা নিজ ভাই ও আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সহায়তায় বিদেশ থেকে সরাসরি কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা মারাত্মক সব বিষাক্ত মাদকের কাঁচামাল মিশরে চোরাচালান করতেন।
অভিযানে যৌথ বাহিনী কায়রোর দুইটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে গোপন মাদক ল্যাবের সন্ধান পায়, যেখানে ৭৫০ কেজিরও বেশি রাসায়নিক কাঁচামাল ও তৈরি মাদকদ্রব্যের পাশাপাশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রচুর গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। ২৮ জন আসামির এই বিশাল মামলায় ২০ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, বিতর্কিত ফোন কল, নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ এবং চাঞ্চল্যকর ভিডিও ক্লিপ আদালতে তথ্যপ্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়।
আদালতের বিচারে সারা খলিফার সাথে ১২ জনের ফাঁসি ছাড়াও ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (সাথে ১ লাখ পাউন্ড জরিমানা) দেয়া হয়েছে এবং ৭ জন নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় খালাস পেয়েছেন। বিচারে যখন অপরাধের বিবরণ পঠিত হচ্ছিল, তখন চোখের জলে বুক ভাসিয়ে বিচারকের কাছে আকুল প্রাণভিক্ষা চান সারা। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, আমার বাবা-মা আমাকে খুব সৎভাবে মানুষ করেছেন; তাঁরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। আমার মাদকের টাকার কোনো প্রয়োজন নেই! আমি জীবনে কোনোদিন একটা সাধারণ সিগারেটও ছুঁয়ে দেখিনি, ঈশ্বরের দোহাই আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ!
তবে প্রসিকিউটরদের শক্তিশালী ডিজিটাল ও ভৌত প্রমাণের সামনে তার অশ্রুজল কোনো কাজে আসেনি। যদিও এটিই তার প্রথম অপরাধ নয়; এর আগে ড্রাইভারকে মারধর করে ভিডিও করা এবং এক যুবককে অপহরণ ও নির্যাতনের মামলায় তার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, মিশরে অ-হত্যার অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড বৃদ্ধিতে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তবে সারা খলিফার আইনি দল উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুতই আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: দ্য সানডে গার্ডিয়ান-এনডিটিভি-ইজিপ্ট ইন্ডিপেন্ডেন্ট