ট্রাম্পের সাথে তুলসির বিরোধের নেপথ্য কারণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান (ডিএনআই) তুলসি গ্যাবোর্ডের আকস্মিক পদত্যাগের পেছনে পারিবারিক কারণ দেখানো হলেও, হোয়াইট হাউসের সাথে তাঁর দীর্ঘ দিনের নীতিগত দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক মতবিরোধই ছিল এর মূল কারণ। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী বিষয়ে গ্যাবোর্ডের বিতর্কিত কিছু পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে তাঁর সম্পর্ক পুরোপুরি বিষিয়ে তুলেছিল।

Tulsi Gabbard 02
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার (অপারেশন মিডনাইট হ্যামার) আগে থেকেই গ্যাবোর্ডের অবস্থান ট্রাম্পের মনঃপূত ছিল না। ইসরাইল-ইরান সংঘাত নিয়ে গ্যাবোর্ড হোয়াইট হাউসের মূল বার্তার বাইরে গিয়ে কথা বলছিলেন। ট্রাম্পের অসন্তোষ চূড়ান্ত রূপ নেয় যখন গ্যাবোর্ড একটি ভিডিও বার্তায় বিশ্বকে ‘পারমাণবিক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে’ বলে সতর্ক করেন এবং যুদ্ধবাজদের দায়ী করেন। ট্রাম্প এটিকে তাঁর নীতির পরোক্ষ সমালোচনা হিসেবে দেখেন।

এরপর কংগ্রেসে দেওয়া গ্যাবোর্ডের এক সাক্ষ্য যেখানে তিনি বলেন, ‘ইরান সক্রিয়ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না’, যা পরে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে যে, ইরান পুনরায় পারমাণবিক কর্মসূচি চালুর চেষ্টা করছে।

Tulsi Gabbard 11
কিন্তু গ্যাবোর্ড সিনেট কমিটিতে তাঁর লিখিত বক্তব্যে স্পষ্ট জানান, মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে এবং তারা তা পুনর্গঠনের কোনো চেষ্টা করেনি। যদিও শুনানির সময় তিনি এই অংশটি এড়িয়ে যান, তবে পরে স্বীকার করেন এটাই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্মিলিত মূল্যায়ন। এছাড়া ইরান আমেরিকার জন্য কোনো ‘আসন্ন হুমকি’ কিনা, তা বলতেও তিনি অস্বীকৃতি জানান।

সাধারণত ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের কাজ হলো আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় করা, যার সাথে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বা রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু ২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের 'ভোট চুরির' মিথ্যা দাবিকে সমর্থন করতে এবং প্রেসিডেন্টের সুনজরে আসতে গ্যাবোর্ড দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী তদন্তে জড়িয়ে পড়েন।

Tulsi Gabbard 12
চলতি বছরের জানুয়ারিতে জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টির নির্বাচন অফিসে যখন এফবিআই তল্লাশি চালায়, তখন গ্যাবোর্ড স্বশরীরে সেখানে উপস্থিত হন। এই ঘটনা তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়, কারণ এফবিআইয়ের ওপর তাঁর কোনো আইনি কর্তৃত্ব ছিল না। চিঠিতে তিনি দাবি করেন,প্রেসিডেন্টের অনুরোধেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন, যা নিয়ে স্বয়ং ট্রাম্পের প্রশাসনই পরে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেয়।

সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্যাবোর্ডের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর তৈরি হওয়া ‘বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ’ গোয়েন্দা কার্যক্রমের মধ্যকার কঠোর সীমারেখা লঙ্ঘিত হয়েছে। এছাড়া পুয়ের্তো রিকো থেকে ভোটিং মেশিন এনে তদন্ত করার মাধ্যমেও তিনি বিতর্কের সৃষ্টি করেন।

Tulsi Gabbard 09
রাজনৈতিক পটভূমি ও বর্তমান অবস্থান

আর্মি রিজার্ভের সদস্য তুলসি গ্যাবোর্ড পূর্বে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একজন জনপ্রিয় কংগ্রেস সদস্য ছিলেন, যিনি প্রথম সামোয়ান-আমেরিকান এবং হিন্দু হিসেবে কংগ্রেসে ইতিহাস গড়েছিলেন। ২০২০ সালে ডেমোক্র্যাট হিসেবে প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার সময় তিনি যুদ্ধবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নেন।

দুই বছর পর দল ত্যাগ করে তিনি ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে সমর্থন করেন এবং তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ট্রাম্পের ট্রানজিশন টিমে কাজ করার পর তিনি আমেরিকার ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পদ ডিএনআই হিসেবে দায়িত্ব পান। তবে, প্রশাসনের যুদ্ধংদেহী নীতির সাথে তাঁর সাবেক যুদ্ধবিরোধী ভাবাদর্শের অমিল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণেই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এই পদ থেকে বিদায় নিতে হলো।

তথ্যসূত্র: সিএনএন