ওয়াশিংটন ডিসির রাজনীতিতে এক ঝোড়ো অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পদত্যাগ করলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক (ডিএনআই) তুলসি গ্যাবার্ড। দীর্ঘ ১৫ মাসের এক চরম নাটকীয় ও বিতর্কিত মেয়াদ শেষে গত শুক্রবার তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন। আগামী ৩০ জুন থেকে তাঁর এই পদত্যাগ কার্যকর হবে।
গ্যাবার্ড তাঁর অফিসিয়াল বিবৃতিতে পদত্যাগের কারণ হিসেবে তাঁর স্বামীর শরীরে একটি বিরল ধরনের হাড়ের ক্যান্সার ধরা পড়ার কথা জানিয়েছেন। এই কঠিন সময়ে স্বামীর পাশে থাকতেই তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে, ওয়াশিংটনের ভেতরের সূত্র এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পদত্যাগের নেপথ্যে কেবল পারিবারিক কারণই নয়, বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে নীতিগত দূরত্ব এবং হোয়াইট হাউসে ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়ার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
বিতর্কিত অতীত ও গোয়েন্দা প্রধানের আসনে বসা
সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য তুলসি গ্যাবার্ড ২০২২ সালে নিজের দল ত্যাগ করে রিপাবলিকান শিবিরে যোগ দেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকে পরিণত হন। কোনো প্রথাগত গোয়েন্দা ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প তাঁকে ১৮টি শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেট নিয়ন্ত্রণের শীর্ষ পদে বসান।
শুরু থেকেই তাঁর এই মনোনয়ন নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠেছিল। অতীতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো একনায়কদের প্রতি তাঁর নরম সুর এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রুশ প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান, উভয় শিবিরের আইন প্রণেতারাই তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। বিশেষ করে ইউক্রেনে মার্কিন অর্থায়নে 'বায়োল্যাব' থাকার দাবি করে তিনি স্বয়ং নিজ দলের সিনেটর মিট রমনির তোপের মুখে পড়েছিলেন।
প্রশাসনের অন্দরমহলে দূরত্ব ও ইরান ইস্যু
গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' এজেন্ডা বাস্তবায়নে গ্যাবার্ড ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই করেন এবং সিআইএ ও ডিএনআই’র প্রায় ৩০ শতাংশ স্টাফ কমিয়ে ফেলেন। কিন্তু ট্রাম্পের অতি-আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির সাথে গ্যাবার্ডের যুদ্ধবিরোধী ভাবাদর্শের সংঘাতে সম্পর্কে অবনতি ঘটে।
২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরাইল সংঘাতের সময় গ্যাবার্ড একটি ভিডিও বার্তায় বিশ্বকে পারমাণবিক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বলে সতর্ক করেন, যা ট্রাম্প নিজের নীতির সমালোচনা হিসেবে দেখেন। এরপর কংগ্রেসে গ্যাবার্ড সাক্ষ্য দেন যে ইরান পরমাণু অস্ত্র বানাচ্ছে না।
ক্ষুব্ধ ট্রাম্প প্রকাশ্যেই তাঁর গোয়েন্দা প্রধানের বক্তব্য নাকচ করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার অনুমোদন দেন। চাপের মুখে গ্যাবার্ড নিজের অবস্থান পরিবর্তন করলেও, ট্রাম্পের মন গলানো সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে ইরান ও ভেনিজুয়েলা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা বৈঠকগুলো থেকে গ্যাবার্ডকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে সাইডলাইনে ঠেলে দেওয়া হয়।
নির্বাচনী কেন্দ্রে অভিযান ও চূড়ান্ত ফাটল
ট্রাম্পের গুড বুকে থাকার জন্য গ্যাবার্ড তাঁর পদের পরিধি ডিঙিয়ে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টির নির্বাচন অফিসে যখন এফবিআই আকস্মিক অভিযান চালায়, তখন সেখানে গ্যাবোর্ডের উপস্থিতি বড় ধরনের কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়।
বৈদেশিক হুমকি মোকাবিলা করার দায়িত্বে থাকা একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা কেন দেশীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে উপস্থিত থাকবেন, তা নিয়ে সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস-চেয়ার মার্ক ওয়ার্নার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ট্রাম্প এই ঘটনায় গ্যাবার্ডের প্রশংসা করলেও, প্রশাসনের ভেতর তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকে যখন গ্যাবার্ডের ডেপুটি জো কেন্ট ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের তীব্র সমালোচনা করে পদত্যাগ করেন। কেন্ট তাঁর পদত্যাগপত্রে লিখেছিলেন যে ইরান কোনো আসন্ন হুমকি ছিল না, কেবল ইসরাইলি লবির চাপে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। গ্যাবার্ড তাঁর এই ডেপুটির বক্তব্যের সরাসরি কোনো নিন্দা করতে ব্যর্থ হন, যা ট্রাম্পকে চরম ক্ষুব্ধ করে। মার্চ মাস থেকেই ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের সাথে গ্যাবার্ডকে বরখাস্ত করার বিষয়ে পরামর্শ শুরু করেছিলেন।
এক জটিল অধ্যায়ের অবসান
এক সময়ের ডেমোক্র্যাট তারকা, ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং মার্কিন কংগ্রেসের প্রথম হিন্দু সদস্য তুলসি গ্যাবার্ডের এই পতন অত্যন্ত নাটকীয়। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র গ্যাবার্ডকে একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে বর্ণনা করে বিদায় জানালেও, বিশ্লেষকদের মতে, নিজের নীতি বিসর্জন দিয়ে ট্রাম্পকে তুষ্ট করার রাজনীতি এবং ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী নীতির সাথে খাপ খাওয়াতে না পারার দ্বিমুখী সংকটের কারণেই গ্যাবার্ডের এই পরিণতি।
গ্যাবার্ডের বিদায়ের পর প্রিন্সিপাল ডেপুটি ডিরেক্টর অ্যারন লুকাসকে ভারপ্রাপ্ত গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে, ওয়াশিংটনের আকাশে এখন একটাই প্রশ্ন, পারিবারিক ট্র্যাজেডি কি গ্যাবার্ডের জন্য হোয়াইট হাউসের অপমানজনক বহিষ্কারাদেশ থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নেওয়ার একটি সুযোগ করে দিল?
তথ্যসূত্র: বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান