মার্কিন সেনা না মরলে যুদ্ধবিরতি ভাঙব না: ট্রাম্প

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে উত্তেজনা যখন চরম সীমায়, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি গোপন ও চাঞ্চল্যকর অবস্থানের কথা সামনে এল। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিখ্যাত গণমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের বলেছেন, তেহরান সরাসরি কোনো মার্কিন সেনাকে হত্যা না করা পর্যন্ত তিনি ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি কোনোভাবেই ভেস্তে দেবেন না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সাথে নতুন করে বড় কোনো যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই অনিচ্ছা স্পষ্ট ইঙ্গিত করে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিধ্বংসী যুদ্ধ এড়াতে তিনি আগামী কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে ছোটখাটো হামলা-পাল্টা হামলার মতো পরিস্থিতিও মুখ বুজে সহ্য করতে রাজি আছেন।

Trump
গত এপ্রিল মাসের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে সেই চুক্তি কার্যত সুতোয় ঝুলছে। এপ্রিলের পর এই প্রথম দুই দেশ একে অপরের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ ও তীব্র হামলা চালিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে থাকা বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে একের পর এক মিসাইল ও ড্রোন ছুড়েছে ইরান। এমনকি কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যার ফলে একজন বেসামরিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

এই সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’। এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও আমেরিকার বিরোধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। তেহরান এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিয়েছে; অন্যদিকে ওয়াশিংটনও এর জবাবে ইরানের সমস্ত বন্দরে কঠোর নৌ-অবরোধ বা ব্লকেড জারি করেছে।

আমেরিকার এই পাল্টা হামলাকে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া বলতে নারাজ মার্কিন প্রশাসন। গত বুধবার মার্কিন প্রতিনিধি সভার এক শুনানিতে অংশ নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই পারস্পরিক হামলাকে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধের প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখার চেয়ে বরং এক ধরণের প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

Marco Rubio
রুবিও বলেন, এই হামলাগুলো মূলত ইরানের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জবাব হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। তারা যদি আমাদের জাহাজে গুলি না চালায়, তবে আমরাও গুলি চালাব না। কিন্তু তারা আক্রমণ করলে আমাদের তো অবশ্যই তার প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে।

তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, ইরানের পক্ষ থেকে বারবার এই ধরণের ড্রোন ও মিসাইল হামলা ট্রাম্পের ওপর ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা এই দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতাকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সামরিক সংঘাত এড়ানোর পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বড় কূটনৈতিক চাল রয়েছে। ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, তিনি ইরানের সাথে একটি ঐতিহাসিক ও শান্তি চুক্তি সইয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।

এই সম্ভাব্য চুক্তির মূল শর্তগুলো অত্যন্ত কঠোর। এর অধীনে হরমুজ প্রণালীকে পুনরায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করা হবে, ইরানের সব পরমাণু কর্মসূচি ও ল্যাব চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং দেশটির কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সমস্ত মজুত সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সফল করতে এবং নিজের রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই ট্রাম্প আপাতত মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের ছোটখাটো হামলাগুলোকে হজম করার নীতি গ্রহণ করেছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই বারুদের স্তূপে শান্তি কতদিন বজায় থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।