কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে দশকের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর ধসে পড়া ভবন ও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে অলৌকিকভাবে কাউকে জীবিত উদ্ধারের আশায় দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন জরুরি সেবা-কর্মী, সেনা, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সোমবারে ভোরে দেশের অন্যতম প্রধান কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলে আঘাত হানা ৭.৪ মাত্রার এই শক্তিশালী ভূমিকম্পে ইতোমধ্যে অন্তত ১৬৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের তীব্রতায় ক্যালি ও পেরেইরার মতো বড় শহরগুলোতে একাধিক বহুতল ভবন মুহূর্তেই ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। মানিজালেস শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী ক্যাথেড্রালের একটি চূড়ায় বড় ধরনের ফাটল ধরেছে।প্রায় ২২ লাখ মানুষের শহর ক্যালিতে অন্তত ৮৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ বা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে অসংখ্য মানুষকে রাস্তায় আশ্রয় নিতে হয়েছে।
ৱ শহরের একটি প্রধান হাসপাতালের শিশুসেবা বিভাগের সুবিধাসহ ওপরের বেশ কয়েকটি তলা ধসে পড়ে। বহু রোগী ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েন এবং বাইরে তৈরি হওয়া ধ্বংসস্তূপের ওপরই প্রায় ৬০০ রোগীকে জরুরি চিকিৎসা সেবা দেন চিকিৎসকরা।
আন্যদিকে প্রসূতি ও কৃষিনির্ভর রিসারালদা রাজ্যের রাজধানী পেরেইরাতে ৬৬ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। পুরো আবাসিক এলাকা কংক্রিট ও দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া স্টিলের স্তূপে পরিণত হয়েছে। এমনকি শহরের বিমানবন্দরটির ছাদের বড় অংশ ধসে পড়ে, যা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে। আর ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থিত গ্রাম প্রধান চোকো প্রদেশে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
উদ্ধার অভিযান ও স্থানীয়দের প্রচেষ্টা:উদ্ধারকর্মীরা ভারী এক্সকাভেটর যন্ত্রের পাশাপাশি খালি হাতেও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মানুষকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। ক্যালি শহরের বাসিন্দা এবং উদ্ধারকাজে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দেওয়া কারমেন ইয়াসমিন গার্সিয়া জানান, তাদের দল একটি ধসে পড়া ভবন থেকে ৭ জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও আরও চারজন মানুষ ও একটি কুকুর সেখানে আটকা পড়ে আছে। হাত দিয়ে আঁচড় কাটার শব্দ পাওয়ার পর থেকে তারা আশা ছাড়ছেন না এবং কোদাল ও লাঠি নিয়ে সবাইকে সহায়তার আহ্বান জানান।
নিরাপত্তা জোরদার ও রাষ্ট্রপতির পদক্ষেপ: কয়েকদিন আগে ক্ষমতা নেওয়া দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলফ্রেডো দে লা এস্প্রিয়েল্লা জানান, ক্যালিতেই ৩৫ জন নিহত এবং ১৮৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। লুটপাটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শান্তি বজায় রাখতে ক্যালি ও পেরেইরা শহরে রাতে কারফিউ জারি করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিশ্চিত করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য অতিরিক্ত ১,০০০ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জনগণের সুরক্ষায় কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিভেদ না রেখে সবাই এক হয়ে কাজ করতে হবে।
অতীত ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি: এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ১৯৯৯ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যা একই কফি অঞ্চলে ১,০০০-এর বেশি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। এছাড়া গত জুনে প্রতিবেশী দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভূমিকম্পে ৬,৩০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর স্মৃতিকেও এটি আবারও নতুন করে উসকে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স