মেক্সিকো সিটির রাজপথে ফালাফেল ও শাওয়ারমার ঘ্রাণ!

বিমানের ইঞ্জিনের বিকট গর্জন কিংবা বর্ষার মেঘের মেঘগর্জন, এখনো আতঙ্কে শিউরে ওঠেন গাজার ৩৫ বছর বয়সী সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবেদ। গাজায় ২০২৫ সালের সেই ভয়াবহ ইসরায়েলি বিমান হামলার ক্ষত তিনি আজও বহন করছেন, যে হামলায় প্রাণ হারিয়েছিল তাঁর চার বছরের অবোধ কন্যাসন্তান। কিন্তু সেই ভয়াবহ স্মৃতির বিষাদ বুকে চেপে, শোককে শক্তিতে পরিণত করে নতুন এক যুদ্ধের ময়দানে নেমেছেন আবেদ। এখন আর সকালে বোমার আতঙ্কে ঘুম ভাঙে না, বরং সূর্য ওঠার আগেই নিজের মোটরাইজড ট্রিসাইকেলে ফিলিস্তینی ঐতিহ্যবাহী খাবার সাজিয়ে মেক্সিকো সিটির অভিজাত পাড়ায় ব্যবসার কাজে বেরিয়ে পড়েন তিনি।

Mexico Palastine 01
মেক্সিকোর সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর থেকে সেখানে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর পর বাস্তুচ্যুত হওয়া ১৯ লাখ মানুষের ক্ষুদ্র অংশ মেক্সিকোতে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে মেক্সিকোতে বসবাসরত ১৬০ জন ফিলিস্তিনির একজন হলেন এই আবেদ। গাজার বিভীষিকা স্মরণ করে তিনি বলেন, গাজায় বিমান চলাচলের শব্দ ছিল মৃত্যুর পরোয়ানা। সেই আতঙ্ক আজও তাড়া করে ফেরে, কোনো কিছু ভাবার আগেই শরীর ভয়ে রিফ্লেক্স করে ওঠে।

Mexico Palastine 02
তবে মেক্সিকোতে আবেদনের আসার পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। এক দশক আগে তাঁর বাবা কামাল আবেদ গাজা ছেড়ে মেক্সিকোতে এসে নাগরিকত্ব পান। যুদ্ধ শুরুর পর পরিবারকে উদ্ধার করতে মিসর পর্যন্ত গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বাবা। এরপর বড় ভাই শাদি মানবাধিকার সংস্থা ও আইনজীবিদের সহযোগিতায় টানা কয়েক মাসের অক্লান্ত চেষ্টায় ১৮ জন সদস্যকে গাজার নরককুণ্ড থেকে বের করে আনেন। জর্ডান ও তুরস্ক হয়ে ২০২৫ সালের মে মাসে মেক্সিকো সিটিতে এসে পৌঁছান তাঁরা এবং পান স্থায়ী রেসিডেন্সি। রাজনীতি থেকে দূরে থেকে শুধু শান্তিতে বাঁচার আকুতি জানানো আবেদনের এই লড়াকু গল্প এখন মেক্সিকো সিটির মানুষের মুখে মুখে!

Mexico Palastine 04
বর্তমানে কনদেসার খোলা বাজারে ট্রিসাইকেলে করে হুমুস, বাবা গানুশ, ফালাফেল, শাওয়ারমা ও কাবাব বিক্রি করে পুরো এলাকা জমিয়ে তুলেছেন আবেদ। তাঁর হাতের খাবারের জাদুতে মজেছেন মেক্সিকানরা। রোববারে অন্য একটি বাজারে বিক্রি করেন এবং ছুটির দিনে স্ত্রীর ক্যাটারিং ব্যবসায় সাহায্য করেন। শুধু আবেদই নন, তাঁর ছোট ভাই ফাদিও মেক্সিকোতে দারুণ জনপ্রিয়। স্প্যানিশ ভাষায় ভিডিও বানিয়ে ফাদি সোশ্যাল মিডিয়ায় হুলস্থুল ফেলে দিয়েছেন, ইনস্টাগ্রামে 'hijo.de.palestina' (ফিলিস্তিনের পুত্র) নামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার!

ছাইভস্ম থেকে ঘুরে দাঁড়ানো এই পরিবারের গল্প এখানেই শেষ নয়; মেক্সিকোতে যুক্ত হয়েছে নতুন সদস্য। চলতি মে মাসে জন্ম নিয়েছে আবেদনের ছোট ছেলে ইউসুফ, যে জন্মসূত্রেই মেক্সিকোর নাগরিক। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে আবেদ গর্ব করে বলেন, ওর জন্ম মেক্সিকোর মাটিতে হতে পারে, কিন্তু ওর হৃদয়ে স্পন্দিত হয় গাজার শিকড়!

তথ্যসূত্র: রয়টার্স