নাভির নোবেল জয়ের পরপরই আইসিসির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

নোবেল শান্তিপুরস্কারে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাইয়ের ভূষিত হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক আদালতের ওপর সরাসরি কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।

ওয়াশিংটনের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো মিত্রদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এক বড় ধরণের কূটনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হলো।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার ওপর এক নজিরবিহীন আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে আইসিসি। আদালত থেকে এক বিবৃতিতে এই পদক্ষেপকে আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তরের ওপর চরম হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

আইসিসির ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রকে বিশ্বব্যবস্থা রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, আইসিসি একা লড়াই করতে পারে না। এর ভবিষ্যৎ এখন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর হাতে। এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিরক্ষা নয়, বরং আইনের শাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন। ইতিহাস এই মুহূর্তের বিচার করবে।

২০০২ সালে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই ট্রাইব্যুনালের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। এর আগে সংস্থাটির প্রসেকিউটর ও বিচারকদের ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এবার পুরো আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ওয়াশিংটন। ফলে আইসিসিকে পরিষেবা দেওয়া বা লেনদেন করা যে কোনো আন্তর্জাতিক বা মার্কিন প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে এই নিষেধাজ্ঞার কথা নিশ্চিত করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই আইসিসিকে কোনো আমেরিকান নাগরিকের বিচার করতে দেবেন না। সেই কারণে আজ যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। আমরা এই ভণ্ড আদালতের সাথে সব লেনদেন নিষিদ্ধ করব, তাদের সম্পদ ও তহবিল কেটে নিয়ে সংস্থাটির কার্যক্রম স্থবির করে দেব।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে আরও বলেন, হয় আইসিসি তাদের হুমকি বন্ধ করবে, না হয় আমরাই আইসিসিকে বন্ধ করে দেব। আমাদের আশা মিত্র দেশগুলো, যারা আমেরিকার সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল, তারা আইসিসিকে নিয়ন্ত্রণে আনবে।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ছয় মাসের একটি প্রাথমিক সময়সীমা ও কিছু শিথিলতাসহ এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে। মূলত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যদের কর্মকাণ্ডের তদন্ত পরিচালনা করায় চটেছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে আইসিসির ডেপুটি প্রসেকিউটর নাজহাত শামিম খান জানান, নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বিচারকে ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে নেয়া হলেও আমাদের বিচারিক কাজ ও তদন্ত স্বাভাবিক নিয়মে চালু থাকবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ব্যতীত ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় সব সদস্য দেশই আইসিসির সমর্থক। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তাদের বিশেষ ‘ব্লকিং মেকানিজম’ ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছেন আইসিসির রেজিস্টার অসভালদো জাবালা গিলার। আইসিসি কর্তৃপক্ষ কয়েক মাস ধরেই এই নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা থেকে মাইক্রোসফট সফটওয়্যার ছেড়ে বিকল্প ওপেন-সোর্স ব্যবহারে রূপান্তর এবং নতুন ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা সেরে রেখেছে। নোবেল কমিটি আইসিসির ওপর রাজনৈতিক হামলার সমালোচনা করে পিল্লাইকে নোবেল দিলেও তা উপেক্ষা করেই নিজেদের আগ্রাসী অবস্থান স্পষ্ট করল ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স