আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বহুমাত্রিক প্রভাব এবার রূপ নিল চরম রাজনৈতিক সংঘাত ও কাদা ছোড়াছুড়িতে। শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আমার মনে হয় ইউক্রেনের এবার একজন নতুন প্রেসিডেন্ট বেছে নেয়ার সময় এসেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল সরবরাহ চুক্তি ঘোষণার ঠিক একদিন পরেই প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি ট্রাম্পের এই অভূতপূর্ব আক্রমণ বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার, যখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডিজেল সম্পর্কিত এক চুক্তি সই হয়। ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায়, আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কোণঠাসা ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার ওপর থেকে ডিজেল রপ্তানির আংশিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই চুক্তির তীব্র প্রতিবাদ জানান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে জেলেনস্কি বলেন, আমেরিকার এই শিথিল মনোভাবই মস্কোকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
আমেরিকার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরদিনই শনিবার ইউক্রেনের জাহাপোরিজিয়া শহরের আবাসিক এলাকায় পাঁচটি গ্লাইড বোমা দিয়ে হামলা চালায় রাশিয়া। এতে ৩ জন শিশুসহ অন্তত ২০ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। ধসে পড়া অ্যাপার্টমেন্টের ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে চোখের জলে নিজের ৬ বছরের নাতনির কথা স্মরণ করেন এক বৃদ্ধ, যার কয়েকদিন পরেই জন্মদিন ছিল। চলতি সপ্তাহে ক্রামাতোরস্ক ও প্রিলুকিসহ বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার হামলায় প্রায় ৮০ জন বেসামরিক লোক প্রাণ হারিয়েছেন। জেলেনস্কি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে রাশিয়া ধন্যবাদ জানিয়েছে এভাবে বোমা বর্ষণ করে।"
তবে এই সমালোচনার মুখে ট্রাম্প জেলেনস্কির ওপরই দায় চাপিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইউক্রেন যেভাবে রাশিয়ার তেল শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলোতে একের পর এক ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, তার ফলেই বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে এবং আমেরিকার কৃষক ও খামারিরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ট্রাম্প বলেন, আমি তাঁকে বারবার বলেছি, অন্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাও, কিন্তু রিফাইনারিতে হাত দিও না। তিনি শোনেননি। তাঁর উচিত এখনই এটা বন্ধ করা। এমন একজন নেতা দরকার যিনি শান্তি চুক্তি করতে পারেন।
ট্রাম্পের এই ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করেছেন খোদ মার্কিন আইনপ্রণেতারা এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেলেনস্কির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে রাশিয়ার ওপর ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, মিয়ামিতে ইউক্রেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে চলা গোপন শান্তি আলোচনা চলাকালীনই ট্রাম্পের এককভাবে এই চুক্তির ঘোষণা ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দলকে হতবাক করেছে। সাড়ে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধ থামানোর পরিবর্তে মার্কিন প্রশাসনের এমন পদক্ষেপে বিশ্ব রাজনীতি এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স