যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ট্রাম্প প্রশাসনের এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক পদক্ষেপে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কড়া ট্রাম্প-সমালোচক ও কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের ওয়াশিংটন ডিসির বাড়িতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি। সোমবার প্রাক-ভোরে চালানো এই আকস্মিক তল্লাশিকে কেন্দ্র করে তোলপাড় শুরু হয়েছে দেশটির রাজনীতিতে।
মার্কিন বিচার বিভাগের মুখপাত্র জানান, বিচারবিভাগ কর্তৃক অনুমোদিত ওয়ারেন্ট নিয়ে 'হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস' (যা ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা ICE-এর একটি অংশ) চলমান এক ফেডারেল তদন্তের অংশ হিসেবে এই অভিযান চালিয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্র সূত্রে জানা গেছে, এটি একটি সম্ভাব্য 'ইমিগ্রেশন জালিয়াতি' বা অভিবাসন জালিয়াতি সম্পর্কিত তদন্ত, যার লক্ষ্য ইলহান ওমর যখন শিশু ছিলেন তখন তাঁর প্রয়াত বাবা কর্তৃক দাখিলকৃত অভিবাসন নথিপত্র পুনর্বিবেচনা করা। এর আগে ট্রাম্প মনোনীত হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী মার্কওয়েইন মুলিন খোলাখুলি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশের প্রাথমিক নথিতে ত্রুটি পাওয়া গেলে ইলহান ওমরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিপোর্ট বা বহিষ্কার করা হবে।
অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিয়ে ৪৪ বছর বয়সী মিনেসোটার এই আইনপ্রণেতা লেখেন, গত ১০ বছর ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভিত্তিহীন মিথ্যা এবং কুৎসা রটিয়ে আমাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক ভয়ভীতি প্রদর্শনেরই নতুন এক রূপ। তবে আমাকে এভাবে চুপ করানো যাবে না। উলেখ্য, ২০১৮ সাল থেকে টানা বিজয়ী হয়ে আসা ইলহান ওমর আগামী তিন নভেম্বরের নির্বাচনে পঞ্চম মেয়াদের জন্য লড়ছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে 'ক্ষমতার চরম অপব্যবহার' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতারা। মার্কিন হাউস ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফ্রি সহ অন্যান্য নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, একজন নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য ও তাঁর পরিবারের ওপর ট্রাম্পের এই গণ-বহিষ্কারকারী যন্ত্রের আক্রমণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি রাজনৈতিক শত্রুদের দমনে বিচার বিভাগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এক নজিরবিহীন উদাহরণ।
মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের ঠিক আগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে ট্রাম্প খোলাখুলি ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, মার্কিন বিচার বিভাগের নীতিমালায় নির্বাচনকে প্রভাবিত করা এড়াতে নির্বাচনের অন্তত ৬০ দিনের মধ্যে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য তদন্তমূলক পদক্ষেপ না নেয়ার দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে। তবে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির আইন বিশেষজ্ঞ রান্ডাল এলিয়াসনের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে প্রচলিত সেসব নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না।
উলেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর সমালোচক হিসেবে পরিচিত সাবেক এফবিআই পরিচালক জেমস কোমি, নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিটিয়া জেমস এবং সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের মতো হেভিওয়েট ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগকে দিয়ে তদন্ত ও মামলা করানোর একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
সোমালি-আমেরিকান মুসলিম নারী প্রতিনিধি ইলহান ওমরের ওপর ট্রাম্পের এই ধারাবাহিক আক্রমণকে বহু মানবাধিকার সংস্থা ও ডেমোক্র্যাটরা 'বর্ণবাদী ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ' হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছেন। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে ওমরের বাড়িতে এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকালীন রাজনীতিকে আরও বেশি সহিংস ও মেরুকৃত করে তুললো।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স