ব্রাজিলের মসনদ দখলে লুলা-ফ্লাভিওর চরম লড়াই

লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি ব্রাজিলে রোববার এক হাড্ডাহাড্ডি রান-অফ বা দ্বিতীয় ধাপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে দেশটি চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়বে, নাকি বামপন্থী ধারা বজায় রাখবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফলাফল ডানপন্থীদের পক্ষে গেলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ব্রাসিলিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হবে, যা পুরো অঞ্চলজুড়ে সাম্প্রতিক ডানপন্থী রাজনৈতিক পুনরুত্থানের হাওয়াকে আরও বেগবান করবে।

প্রেসিডেন্ট পদে এই ঐতিহাসিক লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছেন বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা এবং ডানপন্থী সেনেটর ফ্ল্যাভিও বোলসোনারো। ৪৫ বছর বয়সী ফ্ল্যাভিও বোলসোনারো হলেন দেশটির কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ পুত্র। চলতি মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের নির্বাচনে সব বুথফেরত জরিপকে ভুল প্রমাণ করে বিস্ময়করভাবে শীর্ষ স্থান দখল করেছিলেন ফ্ল্যাভিও। প্রথম ধাপে তিনি লাভ করেন ৪৭ শতাংশ ভোট এবং লুলা পান ৪৫ শতাংশ ভোট।

L
নির্বাচনী সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তরুণ বোলসোনারোর জয় লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পবান্ধব ডানপন্থী নেতাদের জয়ের ধারাবাহিকতাকে প্রসারিত করবে। অন্যদিকে লুলা চতুর্থ মেয়াদে জয়ী হলে তা ওয়াশিংটনের জন্য হবে হতাশার, কারণ বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে লুলা প্রশাসনের সঙ্গে ট্রাম্পের একাধিকবার মতবিরোধ ঘটেছে। এমনকি বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে ফাঁস করেছে যে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বলসোনারো পরিবারকে পুনরায় ক্ষমতায় আনতে পর্দার অন্তরালে প্রচারণা চালানো হয়েছিল।

ব্রাজিলের এই নির্বাচনজুড়ে দুর্নীতির কেলেঙ্কারি, চরম অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং নির্বাচনে আমেরিকার হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রাধান্য পেয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের অপরাধে ২০২৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে দণ্ড দেওয়া হয়। ফ্ল্যাভিও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি নির্বাচিত হলে বাবাকে ক্ষমা করে দেবেন।

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প জাইর বোলসোনারোর বিচারকে 'ডাইনি শিকার' হিসেবে আখ্যা দিয়ে ব্রাজিলের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে কিছুটা শিথিল করা হলেও বাণিজ্য নীতির অজুহাতে চলতি বছর ব্রাজিলের ওপর নতুন কর চাপানো হয়েছে। লুলা অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠ হয়ে ব্রাজিলীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

Lula vs Bolsa 2
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব কিছুটা কমলেও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পারিবারিক ঋণের চাপে জর্জরিত ভোটারদের মন জয় করতে লুলার প্রশাসনকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। পাশাপাশি দেশজুড়ে গ্যাং কালচার ও অপরাধ বৃদ্ধি ভোটারদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। এই নিরাপত্তাহীনতাকে পুঁজি করে ফ্ল্যাভিও বলসোনারো কঠোর অপরাধ দমন নীতি, সর্বোচ্চ নিরাপত্তার নতুন কারাগার নির্মাণ এবং মারাত্মক যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে রাসায়নিক খাসিকরণের মতো বিতর্কিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

রিও ডি জেনিরোতে নিজের ভোট দিয়ে ফ্ল্যাভিও জনগণকে বৃষ্টি বা রোদ যাই থাকুক, কেন্দ্রে এসে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। আর লুলা সাউ পাওলোর নিকটবর্তী সাও বের্নার্দো দো কাম্পোতে ভোট প্রদান করেন। সর্বশেষ জরিপগুলোতে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে ঐতিহাসিক রেকর্ড বলছে, প্রথম ধাপের নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকেও পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট পদে জয় পাওয়ার নজির ব্রাজিলের ইতিহাসে নেই, যা ফ্ল্যাভিওকে খানিকটা মনস্তাত্ত্বিক এগিয়ে রাখছে। প্রথম ধাপে ফ্ল্যাভিওর দল 'লিবারেল পার্টি' কংগ্রেসেও বড় জয় পাওয়ায়, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে আইন প্রণয়ন যেমন সহজ হবে, তেমনি লুলা জয়ী হলে সরকার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স