ট্রাম্পের ক্ষমতা ও নীতিতে কতটা লাগাম টানতে পারবে কংগ্রেস?

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে নজিরবিহীনভাবে হারিয়ে করে কংগ্রেসের দুই কক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয়েরই নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। আগামী বছরের জানুয়ারির শুরুতেই যখন নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন বসবে, তখন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে যাবে।

এতদিন দুই কক্ষে রিপাবলিকানদের একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এখন থেকে যেকোনো নতুন আইন পাসে ডেমোক্র্যাটদের বাধার মুখে পড়তে হবে হোয়াইট হাউসকে। তবে মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াও প্রেসিডেন্টের হাতে এখনো অনেক নির্বাহী ক্ষমতা রয়ে গেছে, যা মার্কিন রাজনীতির আগামী দিনগুলোকে নতুন এক দ্বৈরথের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

Trump 01
ইরান সংঘাত ও সামরিক বাজেট:
মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এই চরম ব্যর্থতার পেছনে ইসরাইল-ইরান যুদ্ধের যে বড় ভূমিকা ছিল, তা খোলামেলা স্বীকার করেছেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভোটারদের ক্ষোভের একটি অংশ ছিল ইরান সংঘাত নিয়ে, তবে জনগণ এটাও বুঝেছে যে, তিনি দেশের স্বার্থেই পদক্ষেপ নিয়েছেন। বাস্তবে নিত্যপণ্যের চড়া দাম, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মাঝে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, যাকেই নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে ডেমোক্র্যাটরা।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই ইসরাইলের সাথে যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরু করেছিলেন ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাটরা এখন চাইলেই আগামী ১১ ডিসেম্বরের সরকারি বাজেট বিল নবায়নের সময়ে অতিরিক্ত সামরিক বরাদ্দ আটকে দিয়ে ট্রাম্পকে চরম কোণঠাসা করে ফেলতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের গবেষক জেমস বয়েজের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনারা অবস্থানকালে হুট করে বাজেট ছাঁটাই করা মোটেও সহজ হবে না; কারণ এতে মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগ উঠতে পারে।

এ ছাড়া ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’ ব্যবহার করে ট্রাম্পের যুদ্ধ নীতি থামানোর সম্ভাবনাও বেশ ক্ষীণ। এই আইনে বলা আছে, প্রেসিডেন্ট কোনো হামলা মোকাবিলায় সাময়িক পদক্ষেপ নিতে পারলেও ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন বা যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারবেন না। অবশ্য প্রেসিডেন্ট এতে ভিটো দিতে পারেন, যা ভাঙতে হলে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশের অভাবনীয় বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতার (সুপারমেজরিটি) প্রয়োজন হয়—যা নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নেই।

তবে ইউসিডি ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক স্কট লুকাস মনে করেন, নীতিতে পরিবর্তন আনতে ডেমোক্র্যাটরা এখন ট্রাম্পের নিজের দলের অসন্তুষ্ট নেতাদের সাথে হাত মেলাতে পারেন। যেমন ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শুরু থেকেই এই ইরান যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং সম্প্রতি তেহরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগও নিয়েছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্পের মেয়াদের এটি শেষ সময় হওয়ায় এবং তাঁর নতুন করে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ না থাকায়, তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

Trump Iran Nuclear 1
শুল্ক নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য:
আমেরিকাকে বাণিজ্য ঘাটতি থেকে মুক্ত করতে ট্রাম্প প্রায় ৯০টি দেশের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঢালাও শুল্ক আরোপ করেছিলেন। গত বছর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এই পদক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণা করলেও ট্রাম্প অন্য আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখেন। তবে আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী এই ধরনের শুল্ক ১৫০ দিনের বেশি চালাতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন আবশ্যক।

ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ তুলেছেন, এসব শুল্কের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মার্কিনদের, যারা নিত্যপণ্যের অতিরিক্ত দাম গুনছেন। নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা মার্কিন আমদানিকারকদের স্বস্তি দিতে নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্ক ছাড়ের বিল আনতে পারে। তবে বাণিজ্য নীতিতে পুরোপুরি পরিবর্তন আনতে হলে ২০২৮ সালের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। একই সাথে পূর্বে সংগৃহীত কোটি কোটি ডলারের অবৈধ শুল্কের টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হবে কি না, তা নিয়ে আদালত ও আইনসভার লড়াই এখনো চলমান। তবে একমাত্র বিষয় যেখানে দুই দলই একমত, তা হলো চীনের কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার রুদ্ধ করা। ‘রিমোট অ্যাকসেস সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ ও ‘চিপ সিকিউরিটি অ্যাক্ট’-এর মতো বিলে উভয় দলেরই সমর্থন থাকবে।

Trump 01
অভিবাসন, তদন্ত ও অভিশংসনের হুমকি:
কংগ্রেসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাতে আসায় এখন সব প্রভাবশালী স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ চলে যাবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। ফলে যেকোনো সরকারি নথি তলব ও যে কাউকে তলব (সাবপিনা) করার একচ্ছত্র ক্ষমতা পাবেন তারা। এতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসা, জেফরি এপস্টাইনের সাথে তাঁর বিতর্কিত সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের যুদ্ধ পরিচালনার ধরন নিয়ে ব্যাপক সরকারি তদন্ত শুরু হতে পারে। এমনকি ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন প্রস্তাবও আনা হতে পারে।

পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের বহুল বিতর্কিত অভিবাসন নীতি ও গণ-বহিষ্কার অভিযান নিয়ে ব্যাপক তদন্তের পরিকল্পনা করছে ডেমোক্র্যাটরা। ইউএস ট্যাক্স এজেন্সির (আইআরএস) সাথে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের গোপন আঁতাতের খবর প্রকাশ্যে আনতে তারা তলবি পরোয়ানা জারি করবে। সম্প্রতি ফক্স নিউজের এক জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ নিবন্ধিত মার্কিন নাগরিকই মনে করেন ট্রাম্পের কট্টর অভিবাসন কড়াকড়ি ‘অতিরিক্ত সীমালঙ্ঘন’ করেছে। যদিও প্রশাসন দাবি করে আসছে আটককৃতদের ৭০ শতাংশই অপরাধী, তবে আদালত কর্তৃক অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই অভিবাসীদের জেলে পোরা নিয়ে বিস্তর আইনি ও মানবাধিকারমূলক প্রশ্ন উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে, দুই কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দিনগুলোকে প্রবল আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক উত্তেজনায় ভরপুর করে তুলবে, তা বলাই বাহুল্য।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা