ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ভরাডুবির নেপথ্যের পাঁচ কারণ

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে জোড়া ধাক্কা খেয়ে ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে। সাধারণত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাসীন দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে কিছুটা আসন হারালেও, এবার রিপাবলিকানদের এই বিপর্যয়কে সরাসরি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের দুই বছরের চালচলন ও নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের এক চরম রায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 ভোটারদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে শুরু করে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা হ্রাস, রিপাবলিকানদের এই চরম পরাজয়ের নেপথ্যে প্রধান পাঁচ কারণ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

US Market 01
১. জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ

আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিই এবার ভোটারদের ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে মূল্যস্ফীতি ৩.৭ শতাংশের ওপরে উঠেছিল, যা মূলত জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলেই ঘটেছে।

অক্টোবরের শুরুতে খুচরা ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি রেকর্ড ৬.৫২ ডলারে পৌঁছে যায়। ভোটারদের বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, ৭৯ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন যে মূল্যস্ফীতি তাদের পরিবারে তীব্র সংকট সৃষ্টি করেছে। আর ৬২ শতাংশ ভোটার সরাসরি এর জন্য ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতিকেই দায়ী করেছেন।

Trump on Iran
২. অপ্র্রিয় ইরান যুদ্ধ ও পেট্রোল পাম্পের চড়া মূল্য

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর যে সংঘাত শুরু হয়, তা আমেরিকানদের পকেট খালি করে দিয়েছে। জবাবে তেহরান হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম সংকট তৈরি হয়।

আমেরিকার সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত গ্যারেজে গিয়ে সেই চড়া দামের মাশুল গুনতে হয়েছে। ৬৩ শতাংশ ভোটারের মতে ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল, এবং ৭৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন যে এই যুদ্ধই কংগ্রেস নির্বাচনে তাদের ভোট দেওয়ার মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান দিয়ে আর কোনো যুদ্ধে না জড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, এই যুদ্ধকে ট্রাম্পের সেই সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির বড় খেলাফ হিসেবে দেখেছেন তাঁর নিজের কট্টর সমর্থকরাও।

Democrat Abdul El-Sayed 06
৩. ডেমোক্র্যাটদের সুশৃঙ্খল প্রচারণা ও সঠিক কৌশল

ঐতিহ্যবাহী রিপাবলিকান ঘাঁটিগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের বড় কারণ ছিল অত্যন্ত মাটির কাছাকাছি ও বিশ্বস্ত প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া। তারা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বিতর্কে না জড়িয়ে কেবল নিত্যপণ্যের চড়া দাম এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যয় কমানোর মতো বাস্তবসম্মত ইস্যুতে নজর দিয়েছিল।

টেক্সাস ও কানসাসে ধর্মীয় অনুভূতিকে অত্যন্ত সুচারুভাবে উপস্থাপন করেন জেমস তালারিকো ও অ্যাডাম হ্যামিল্টনের মতো প্রার্থীরা। সাউথ ক্যারোলাইনায় সাবেক শিশু বিশেষজ্ঞ অ্যানি অ্যান্ড্রুজ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সবাইকে চমকে জয় নিশ্চিত করেন। আবার মিশিগানে আব্দুল এল-সায়িদ এবং জর্জিয়ায় জন অসফ দুর্নীতি ও জীবনের ব্যয়কমানোর সহজ স্লোগানকে হাতিয়ার করে বাজিমাত করেন। এমনকি ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে ডেমোক্র্যাটরা প্রচারে চমৎকার কাজ করেছে।

US Election 02
৪. প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ধস

সাধারণ ভোটারদের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দুটি বড় বিষয়- মূল্যস্ফীতি ও ইরান যুদ্ধ সরাসরি ট্রাম্পের নিজ সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এমনকি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার কারণে ২০২৪ সালে তাঁর জেতা রাজ্যগুলো ঝুঁকিতে পড়ে যায়। নির্বাচনকে নিজের ওপর এক ধরনের ‘গণরায়’ হিসেবে উপস্থাপন করতে গিয়ে ট্রাম্প উল্টো ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেন।

ভোটের আগের দিনগুলোতে আমেরিকানরা যেখানে মূল্যস্ফীতি কমানোর সুনির্দিষ্ট বার্তা শুনতে চেয়েছিল, সেখানে ওয়াশিংটনে দেওয়া শেষ নির্বাচনি ভাষণে ট্রাম্প দীর্ঘ সময় ধরে হোয়াইট হাউসের পেছনের কৃত্রিম জলাশয়ের বিতর্কিত সংস্কার কাজ নিয়ে আলাপ করে নিজের গ্রহণযোগ্যতা আরও তলানিতে নিয়ে যান।

US Election 05
৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের বিপরীতমুখী অবস্থান

দুই বছর আগে যে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনে ট্রাম্প হোয়াইট হাউস দখল করেছিলেন, এবার তারা ব্যাপকভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তের মূল হিস্পানিক অধ্যুষিত তিনটি এলাকাতেই ডেমোক্র্যাটরা জয় পেয়েছে।

২০২৪ সালের তুলনায় হিস্পানিক কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীরা ২২ শতাংশেরও বেশি ভোট হারিয়েছেন, যার প্রধান কারণ ট্রাম্পের বিতর্কিত ইমিগ্রেশন ও আইসিই  নীতি। পাশাপাশি কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের জোয়ার দেখা গেছে।

মিসিসিপির মতো তীব্র প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ রাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গদের একচেটিয়া সমর্থনের কারণে ১৯৮২ সালের পর এই প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর জেতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি