শেষ পর্যন্ত সমলিঙ্গের মধ্যে বিয়ের স্বীকৃতি দিলো না ভারতের সুপ্রিমকোর্ট। তবে জোর দিয়ে বলেছে যে, সমলিঙ্গের ভিত্তিতে কোন ব্যক্তির সম্পর্ক তৈরির অধিকারকে বিধিনিষেধে আটকানো যায় না। ভারতের সমলিঙ্গ অধিকারকমীরা বলছেন, সুপ্রিমকোর্টের রায় তাদের অধিকার আদায়ে একটি বড় পদক্ষেপ।
রায়ে এই সম্পর্কে যারা থাকেন, তাদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। সমলিঙ্গের মধ্যে বিয়ে বিষয়ে দিল্লিকে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে। আইনসভাই এই বিষয়ে পদক্ষেপ করতে পারে বলে জানিয়েছেন ভারতের শীর্ষ আদালতের বিচারপতিরা।
টানা ১০ দিনের শুনানি পর্বের শেষে প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ গত ১১ মে রায় অপেক্ষমান রাখা হয়েছিলো। মঙ্গলবার শেষ হয়েছে সেই সময়সীমা। গত বছরের ২৫ নভেম্বর সুপ্রিমকোর্ট দুই সমকামী যুগলের দায়ের করা দু’টি মামলা এক করে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশবন্ত চন্দ্রচূড় রায় পড়ার সময় বলেন, সমলিঙ্গ সম্পর্কে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য কেন্দ্র যে কমিটি গড়েছে, এ বিষয়ে সেই কমিটির অগ্রসর হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি কোনও অনড়, অটল বিষয় নয়। বিবাহে বিবর্তন আসে।
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত স্তরে যে কোনও কাজকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত নয়। বিবাহ বর্তমানে যে স্বীকৃতি পেয়েছে, আইন না থাকলে তা সম্ভব হত না। সমকামকে শহুরে বিষয় নয় বলেও উল্লেখ করেছেন প্রধান বিচারপতি। লিঙ্গের ভিত্তিতে সম্পর্কে তৈরির অধিকারও খর্ব করা যায় না।
প্রধান বিচারপতি জানান, সমকামি সম্প্রদায়ের কাউকে তাদের যৌন পরিচয় জানার জন্য থানায় তলব করা যাবে না। তারা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলে তাদের সেখানে জোর করে ফেরানো যাবে না। এই সম্প্রদায়ের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করার আগে পুলিশকে প্রাথমিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে।
সমলিঙ্গে বিয়ে নিয়ে রায় ঘোষণা করতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় বলেন, জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা সবার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আদালত সমলিঙ্গ বিয়ের বৈধতা দিতে পারে না, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কেবল আইনসভা। বিয়ে নিয়ে দেশে দেশে সার্বজনীন কোনো আইনও নেই।
ভারতে বিশেষ বিয়ে আইনে সমলিঙ্গের মানুষের বিয়ের বিষয়টি না থাকা অবৈধ কি না, সেই প্রশ্নও ছিল এ মামলায়। আদালত বলছে, বিচারবিভাগ কেবল আইনের প্রয়োগে জোর দিতে পারে, আইন তৈরি করে সমকামীদের বিয়ের বৈধতা দিতে পারে না। এটি পার্লামেন্টের কাজ।
সরকার তরফ থেকে সমলিঙ্গ বিয়ের বিরোধিতায় আদালতে বলা হয়, এটি একটি শহুরে অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গি। স্বামী-স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভারতীয় পরিবারের একক ধারণার সঙ্গে সমলিঙ্গের বিয়ের ধারণাটি যায় না। আর এ বিষয়ে বিতর্ক ও আলোচনার জন্য পার্লামেন্ট ও আইনসভাই সঠিক জায়গা।
সুপ্রিমকোর্ট ওই বক্তব্যের প্রথম অংশের সঙ্গে দ্বিমত করে বলেছে, ভারতে সমলিঙ্গের মানুষের ইতিহাস অনেক পুরনো, সুতরাং এটা শহুরে অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গি বলা ঠিক হবে না। কিন্তু কেবল আইনপ্রণেতারাই যে এ ধরনের বিয়ের বৈধতা দিয়ে আইন করতে পারে, সে বিষয়ে সাংবিধানিক বেঞ্চ একমত।
অবিবাহিত বা সমকামী দম্পতি চাইলে সন্তান দত্তক নিতে পারে, প্রধান বিচারপতি এমন সিদ্ধান্ত দিলেও এই বেঞ্চের অন্য বিচারকরা তাতে সায় দেননি। উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৮ সালে সমকামী যৌনতাকে বৈধতা দেয় আদালত। ভারত ছাড়া এশিয়া মহাদেশে সমলিঙ্গের সম্পর্কের অনুমতি রয়েছে কেবল তাইওয়ান ও নেপালে।
প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় এবং বিচারপতি সঞ্জয় কিষাণ সমলিঙ্গ যুগলের সন্তান দত্তক নেয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। শুধু বিষমকামী যুগলই সন্তানকে স্থিতিশীল জীবন দিতে পারেন, এই তত্ত্ব মানতে চাননি প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, অবিবাহিত দম্পতি, সমলিঙ্গ দম্পতিও সন্তান দত্তক নিতে পারেন।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠান করে বিয়ে করেন সুপ্রিয় চক্রবর্তী এবং অভয় ডাং। তাঁরাই ভারতের প্রথম সমকামী যুবক, যাঁরা বিয়ে করেছেন। এখন বিশেষ বিবাহ আইনের স্বীকৃতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন ওই যুগল। দীর্ঘ ১৭ বছরের সম্পর্কের পর পার্থ ফিরোজ মলহোত্র এবং উদয় রাজ বিয়ে করেছেন।
আদালতে ওই যুগল জানান, তাঁরা দু’টি শিশুকে লালনপালন করছেন। কিন্তু যে হেতু তাঁদের বিয়ের কোনও আইনি স্বীকৃতি নেই, তাই আইনত শিশুদের অভিভাবক হতে পারছেন না তাঁরা। এর পরেই দেশের বিভিন্ন আদালতে জমে থাকা সমলিঙ্গ সংক্রান্ত যাবতীয় মামলা একসঙ্গে শোনার সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিম কোর্ট। তারই রায় ঘোষণা হল মঙ্গলবার। সুপ্রিমকোর্টের রায়ে খুশি নন মামলাকারীরা।