ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের আঁচ এবার সরাসরি এসে লাগল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে। ওয়াশিংটন পোস্ট এবং দক্ষিণ কোরিয়ার একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন করা অত্যাধুনিক মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা 'থাড'-এর একটি অংশ জরুরি ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ সংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই দুনিয়াজুড়ে চর্চা তুঙ্গে।
ইরানের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরাইলি ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই ওয়াশিংটন এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
'
টার্মিনাল হাই-অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স' বা থাড হলো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মার্কিন সংস্থা লকহিড মার্টিনের তৈরি এই সিস্টেমটি মূলত 'হিট-টু-কিল' প্রযুক্তিতে কাজ করে। অর্থাৎ, এটি কোনো বিস্ফোরক ছাড়াই শুধু প্রচণ্ড গতিবেগের ধাক্কায় ধেয়ে আসা শত্রুর ব্যালিস্টিক মিসাইলকে মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দিতে পারে।
এই সিস্টেমের বিশেষত্ব হলো- এটি বায়ুমণ্ডলের ভেতরে এবং বাইরে, উভয় স্তরেই ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম। এটি স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল রুখতে অত্যন্ত কার্যকর। প্রতিটি থাড ব্যাটারিতে ৬টি লঞ্চার এবং ৪৮টি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল থাকে। একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমের দাম প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যে পরিমাণ ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুঁড়ছে, তাতে আমেরিকার বর্তমান মজুত ফুরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। এছাড়া গত সপ্তাহে খবর ছড়িয়েছিল, জর্ডানে থাকা একটি থাড সিস্টেমের ৩০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের রাডারটি ইরানি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই ঘাটতি পূরণ করতেই এখন দক্ষিণ কোরিয়ার সিওংজু বিমানঘাঁটি থেকে লঞ্চারগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
২০১৭ সালে যখন প্রথম উত্তর কোরিয়ার পরমাণু হামলার হাত থেকে বাঁচতে সিউলে থাড বসানো হয়েছিল, তখন থেকেই স্থানীয়রা প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। এবার সেই অস্ত্র সরিয়ে নেয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুং একটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, আমরা এই অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আমাদের আপত্তির কথা জানিয়েছি। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, আমরা আমাদের অবস্থান পুরোপুরি কার্যকর করতে পারছি না।
যদিও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কোনো প্রভাব পড়বে না, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পিয়ংইয়ংয়ের হুমকির মুখে সিউল এখন আগের চেয়ে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ল।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন সোজা জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় থাড মোতায়েনের বিষয়ে বেইজিংয়ের বিরোধিতার অবস্থান বদলায়নি। চীন মনে করে, থাডের রাডার এতটাই শক্তিশালী যে তা চীনের অনেক গভীরে নজরদারি চালাতে পারে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন নিলসন-রাইট মনে করেন, চীন এই পরিস্থিতিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখবে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে আমেরিকা এখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আগের মতো মনোযোগ দিতে পারছে না। অন্যদিকে, কিম জং উন এই সুযোগে দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে ছোটখাটো উস্কানি দিতে পারেন কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, ইরান যদি এই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে, তবে আমেরিকার মিসাইলের ভাণ্ডার কি ফুরিয়ে যাবে? যদি তাই হয়, তবে বিশ্বের অন্য প্রান্তে (যেমন তাইওয়ান বা কোরিয়া উপদ্বীপ) কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে আমেরিকা কি সেখানে পর্যাপ্ত সাহায্য পাঠাতে পারবে? থাড স্থানান্তরের এই সিদ্ধান্ত আমেরিকার বিশ্বব্যাপী সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি