একদিকে চীনের দ্রুত সামরিক উত্থান, অন্যদিকে এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের আধিপত্য ধরে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ নিয়ে তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান সংশয়, এই দুইয়ের মাঝে পড়ে ভারত-মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এখন নিজেদের এবং একে অপরকে সশস্ত্র করতে এক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে।
গতশনিবার এশিয়ার শীর্ষ নিরাপত্তা সম্মেলন ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’-এ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আঞ্চলিক অংশীদারদের নিজেদের নিরাপত্তার আরও বেশি দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার আহ্বান জানান। তবে ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে আমেরিকার অগ্রাধিকারের জায়গাটি বদলে যাচ্ছে কিনা, এমন একটি উদ্বেগ সম্মেলন জুড়ে বেশ স্পষ্ট ছিল।
সিঙ্গাপুরের এই মুক্তমঞ্চে বিশ্ব সামরিক ও গোয়েন্দা প্রধানদের আশ্বস্ত করে হেগসেথ বলেন, আমরা একই সাথে দুটি বড় কাজ সামলানোর ক্ষমতা রাখি। জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি মার্কিন প্রতিশ্রুতিকে অটল বলে অভিহিত করলেও স্বীকার করেন, কিছু দেশ হয়তো এখনও আমেরিকার এই সংকল্পকে ছোট করে দেখছে।
বার্ষিক এই সম্মেলনের ফাঁকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা প্রধানরা স্পষ্ট করেছেন, প্রথাগত মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে গিয়ে এখন তাঁরা নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন। ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্টো তেওদোরো বলেন, উপস্থিত সকল প্রতিরক্ষা সচিব নিজ নিজ দেশের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত এবং চটজলদি বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন।
ম্যানিলা এখন জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং নিউজিল্যান্ডের মতো অংশীদারদের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করছে। তিনি যোগ করেন, যখন আরও বেশি দেশ এই প্রতিরোধ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, তখন মার্কিন প্রতিশ্রুতি আরও শক্তিশালী হয়; কারণ এখানে সবার শত্রু বা হুমকি অভিন্ন।
এই বৃহত্তর আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু বা ‘হাব’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে জাপান। কোইজুমি জানান, টোকিওর লক্ষ্য হলো চীনের বাইরেও ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি সংযোগ বিন্দু হিসেবে কাজ করা। গত এপ্রিলেই জাপান তাদের কয়েক দশকের পুরনো প্রতিরক্ষা রপ্তানি নীতিতে বড় ধরনের সংস্কার এনেছে; সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে যুদ্ধজাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র রপ্তানির পথ সুগম করেছে। কোইজুমি ফোরামে বলেন, জাপান এখন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।
এদিকে কানাডার চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল জেনি কারিনিয়ান জানিয়েছেন, সাইবার নিরাপত্তা ও নৌ-মহড়ায় জাপান ও ফিলিপাইনের সাথে অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে এই অঞ্চলে তাঁরা নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করছেন।
অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ড তাদের পুরনো যুদ্ধজাহাজগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য জাপান এবং ব্রিটেনের তৈরি জাহাজের কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। নিউজিল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস পেঙ্ক সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রিটেনের সহকর্মীদের সাথে তাঁদের ৫৪ বছরের পুরনো ‘ফাইভ-পাওয়ার ডিফেন্স অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর পরিধি আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর করলেও এশিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতিতে কোনো ভাটা পড়েনি।
ফিলিপাইনের তেওদোরো বলেন, ইরান বা অন্য কোনো অঞ্চলে মার্কিন জড়িয়ে পড়ার কারণে আমাদের আত্মবিশ্বাস ডগমগ হয়ে যায়নি। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ককে তাঁদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একেবারে মৌলিক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন এবং অস্ট্রেলিয়ার অ্যালবানিজ সরকার, উভয় পক্ষই এই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স