জাপানের কাছেই বিতর্কিত একটি দ্বীপে বৃহস্পতিবার ঝটিকা সফর করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো দ্বীপে পুতিনের এই পা রাখা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জাপান। টোকিওর দাবি, পুতিনের এই পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনাকে আরও কঠিন ও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।
রাশিয়ায় 'ইতুরুপ' এবং জাপানে 'এতোরোফু' নামে পরিচিত দ্বীপটি কুরিল দ্বীপপুঞ্জের চারটি বিতর্কিত দ্বীপের একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের পর পরই দ্বীপগুলো দখল করে নেয় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (মস্কো)। তবে জাপান শুরু থেকেই দ্বীপগুলোর ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে এবং দ্বীপগুলো ফেরত পাওয়ার শর্তে দু’দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি সইয়ের পথ খোলা রেখেছিল।
পুতিনের এই সফরের কঠোর নিন্দা জানিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এক টেলিভিশন বার্তায় বলেন, এটি জাপানের জনগণের অনুভূতিতে গভীর আঘাত হেনেছে এবং তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা আশা করি যে রুশ পক্ষ বিষয়টি কতটা গুরুতর তা হৃদয়ঙ্গম করবে।
২০২২ সালে পুতিন ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ সামরিক আগ্রাসনের নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই মস্কো ও টোকিওর সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে। পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি জাপানও রাশিয়ার এই আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানায় এবং মস্কোর ওপর একাধিক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
পুতিনের এই সফরটি এমন একটি সময়ে ঘটল, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের ৮১তম বার্ষিকী পালনের আর মাত্র দুই দিন বাকি। এর ঠিক এক দিন আগেই সিউল ও ওয়াশিংটনের যৌথ সামরিক মহড়ার প্রতিবাদে উত্তর কোরিয়া জাপানের মধ্যবর্তী সাগরে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়। উল্লেখ্য, ২০১০ সালে তৎকালীন রুশ নেতা দিমিত্রি মেদভেদেভ প্রথম নেতা হিসেবে এই বিতর্কিত অঞ্চল পরিদর্শন করেছিলেন।
সীমান্তের এই দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে অনাসৃষ্ট বিরোধের জের ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে কখনো কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি সই হয়নি।
বৃহস্পতিবার জাপানে নিযুক্ত রাশিয়া ও চীনের দুই রাষ্ট্রদূত- নিকোলাই নোযদ্রেভ এবং উ জিয়াংহাও এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল বিকৃত করার যে কোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে একজোটে রুখে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তাঁরা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিকীকরণ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সতর্ক করেন, যা মূলত জাপানের ভূখণ্ড দাবির প্রতি মস্কো ও বেইজিংয়ের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, কুরিল দ্বীপপুঞ্জে এটিই ছিল প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রথম সফর। দেশটির দূরপ্রাচ্যে নৌবাহিনীর মহড়া তদারকি করার পর তিনি দ্বীপের 'ইয়াসনি' মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানা পরিদর্শন করেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল 'ভেস্তি টিভি'-তে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, গাঢ় রঙের স্যুট পরা পুতিন দুটি বড় টুনা ও একটি হালিবুট মাছের সামনে দাঁড়িয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে স্থানীয় মৎস্য উৎপাদন ও মাছের অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে শুনছেন। সফরকালে তিনি স্থানীয় মাছের ডিমও চেখে দেখেন।
স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলার সময় হাসিমুখে পুতিন মন্তব্য করেন, আপনাদের এখানের আবহাওয়া তো চমৎকার, একেবারে কোনো রিসোর্টের মতো সুন্দর! তবে আবহাওয়া যতই মনোরম হোক না কেন, ভৌগোলিক সীমানা কেন্দ্রিক এই রাজনৈতিক উত্তাপ নিশ্চিতভাবেই দু’দেশের সম্পর্কে নতুন শীতলতার জন্ম দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স