শীর্ষ ধনকুবের থেকে কারাগারের নির্জন কক্ষে

রাজনীতিবিদদের সান্নিধ্য, বিলিয়ন ডলারের খেলাধুলা, আর তাসের টেবিলে প্রভাবশালীদের মন জয় করার মুন্সিয়ানা- সবই ছিল তাঁর হাতের মুঠোয়। ২০২১ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষপূর্তির আমেজমাখা দিনে তিয়েনআনমেন স্কয়ারের পোডিয়ামে যখন তিনি দাঁড়িয়েছিলেন, তখন স্যুট-বুটে মোড়ানো হুই কা ইয়ানের চেহারায় ছিল আত্মবিশ্বাসের ঝলক। কিন্তু সময় যে বড় নির্মম!

ঠিক পাঁচ বছর পর, রাজকীয় সেই ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশে গিয়ে ৬৬ বছর বয়সী হুই কা ইয়ানকে দাঁড়াতে হলো আদালতের কাঠগড়ায়। মাথায় ধবধবে সাদা চুল আর গায়ে নীল রঙের কলার শার্ট, দু’পাশে দুই সশস্ত্র রক্ষীর পাহারায় শুনলেন জীবনাবসানের রায়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

China Evergrande 05
তাসের খেলা থেকে বিলিয়নেয়ারের তকমা
: মধ্য চীনের হেনান প্রদেশের এক অজপাড়াগাঁয়ে দাদীর কাছে বড় হওয়া এই স্টিল টেকনিশিয়ান একসময় সস্তা বাড়ি বানিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ব্যাংক থেকে দেদারসে ঋণ নিয়ে জমি কেনা আর কম লাভে দ্রুত ফ্ল্যাট বিক্রির আগ্রাসী কৌশলে এভারগ্র্যান্ডকে চীনের আবাসন খাতের নাম্বার ওয়ান প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। ২০১৭ সালে ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী ৪৫.৩ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে তৎকালীন সময়ে তিনি ছিলেন সমগ্র এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, হুই-এর এই রাজকীয় উত্তরণের নেপথ্যে ছিল এক গোপন তাসের আড্ডা! হংকংয়ের কোটিপতিদের ‘পোকার ক্লাবে’ যোগ দিয়ে চতুরতার সাথে খেলায় প্রচুর টাকা হেরে গিয়ে মূল উদ্যোক্তা নিউ ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা চেং ইউ তুং-এর প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন হুই।

পরিণতিস্বরূপ ২০০৯ সালে অর্থনৈতিক সংকটের মুহূর্তে এভারগ্র্যান্ডের জন্য ১৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পান তিনি, যা তাঁর সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেছিল।

China Evergrande 07
পতনের গল্প ও রায়ের খতিয়ান
: ঋণের পাহাড়ে গড়ে ওঠা এই ভঙ্গুর প্রাসাদ বেশিদিন টেকেনি। ২০২১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির ওই আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে হাঁটার কয়েক মাসের মধ্যেই ৩০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণের বোঝা নিয়ে ডিফল্ট করে এভারগ্র্যান্ড। গত এপ্রিলে টানা তিন বছর বন্দি থাকার পর শেনঝেনের আদালতে তহবিল তছরুপ, জালিয়াতির মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ ও ভুয়া বন্ড ইস্যুসহ আটটি গুরুতর জালিয়াতির অপরাধ স্বীকার করে নেন হুই।

আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার পাশাপাশি তাঁর সব ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিয়েছে। যেই হুই ২০১৮ সালে চ্যারিটি অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চে দাঁড়িয়ে অহংকার করে বলেছিলেন, এভারগ্র্যান্ড ও আমার যা কিছু আছে, সবই পার্টি, দেশ ও সমাজের দেয়া, আজ সেই পার্টির রাজত্বেই লালবাসার বদলে জেলখানাই হলো তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। ফ্ল্যাট বিক্রির স্বপ্ন বিক্রি করে জালিয়াতির চূড়ায় ওঠা এই আবাসন সম্রাটের পতন আধুনিক অর্থনীতির ইতিহাসে এক রূপকথার মতো শিক্ষা হয়ে রইল।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স