তালেবানের আফগানিস্তান শাসনের চিত্র দেখাল বিবিসি

গভর্নর আবদুল্লাহ সারহাদি চিকিৎসাধীন এক কিশোরের ভাঙা হাতের জন্য কিছু টাকা দিলেন, তারপর স্থানীয় একটি মসজিদের কাজের জন্যও কিছু অর্থ তুলে দিলেন। এরপর উত্তর আফগানিস্তানে তাঁর কার্যালয়ে ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। এক তরুণী তালেবানের এই সাবেক কমান্ডারের কাছে এসে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তিনি তাঁর স্বামীর থেকে তালাক চান। তার অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে স্বামী তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন ও মারধর চালিয়েছে। তিনি কোনো অবস্থাতেই পিছু হটতে রাজি নন।

যে দেশে মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা পুরোপুরি নিষিদ্ধ, সেখানে এই ১৮ বছর বয়সী তরুণী অত্যন্ত শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে গভর্নরের সামনে নিজের যুক্তি তুলে ধরেন। তার মুখাবয়ব একটি পূর্ণাঙ্গ বোরকা ও রোদ চশমায় ঢাকা ছিল। তিনি বলেন, যদি আমাদের এক সঙ্গে থাকার কোনো সুযোগ থাকত, তবে আমি আজ এখানে আসতাম না... আমি আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।

তালাকের পথ থেকে তরুণীকে ফেরানোর চেষ্টা করতে গিয়ে পরবর্তীতে গভর্নর সারহাদি মন্তব্য করেন, নারীরা হলো ‘অল্প বুদ্ধিসম্পন্ন’ এবং ‘তাদের বুদ্ধিমত্তায় ঘাটতি রয়েছে’। তাঁর এই কথায় সেখানে উপস্থিত পুরুষ কর্মকর্তা, দেহরক্ষী ও প্রবীণ ব্যক্তিরা হেসে ওঠেন।

সম্প্রতি গভর্নর আবদুল্লাহ সারহাদিকে উত্তরের কুন্দুজ প্রদেশের সামরিক কোরের ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ছবি: বিবিসি
২০২১ সালে মার্কিন সমর্থিত সরকারকে উৎখাত করে তালেবান ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পর, দেশটির দৈনন্দিন জীবনের এক বিরল চিত্র ফুটে ওঠে এই ঘটনায়। এই পাঁচ বছরে আফগান নারীদের বেশিরভাগ কর্মক্ষেত্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং কোনো পুরুষ অভিভাবক ছাড়া একা ভ্রমণ কিংবা পার্কে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে।

বিগত দুই বছর ধরে বিবিসির নেওয়া সাক্ষাৎকার ও তথ্যচিত্রের মাধ্যমে চরমপন্থী এই ইসলামিক গোষ্ঠীর প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে সময় কাটানোর এক অনন্য সুযোগ মেলে। যাদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়, তাদের অনেকেই অতীতে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন কিংবা বছরের পর বছর ভূগর্ভস্থ আস্তানায় আত্মগোপনে ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে তাঁরা সরকারি কর্মকর্তা ও সেনা সদস্য।

তালেবান ক্ষমতায় এসে দাবি করেছিল যে, তারা বদলে গেছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশ নীতিই ১৯৯০-এর দশকে আরোপিত সেই কট্টরপন্থী শরিয়া আইনের পুনরাবৃত্তি।

আমাদের সঙ্গে দেখা হওয়া নেতারা নিজেদের যুক্তিবাদী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও নিজেদের অতীতের হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করতে নারাজ ছিলেন। আর শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের মধ্যে আমরা এক ধরনের অস্বস্তি লক্ষ করেছি।

গভর্নর সারহাদি ‘তুবা’ (আসল নাম নয়) নামের সেই তরুণীকে সংসার চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ছবি: বিবিসি
গভর্নর সারহাদি ‘তুবা’ (আসল নাম নয়) নামের সেই তরুণীকে সংসার চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, নিজেকে জিজ্ঞাসা করো- তালাকের পর তোমাকে কে বিয়ে করবে? তোমাকে অনেক কিছুতে আপস করতে হবে, অন্যথায় তুমি তোমার মর্যাদা ও সম্মান হারাবে। তুবা উত্তর দেন, জনাব গভর্নর, আমার সম্মান ও মর্যাদা তো ইতিমধ্যেই ধুলোয় মিশে গেছে। পাশের ঘরে চুপচাপ বসে কথাগুলো শুনছিলেন তার স্বামী, তিনি তাঁর বক্তব্য দেয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।

শরিয়াহ আইন অনুযায়ী, কোনো নারী যদি স্বামীর কাছ থেকে তালাক চান, তবে বিয়ের সময় পাওয়া কিছু বা পুরো অর্থ স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি আর্থিক সমঝোতা করা হয়। তবে এই তরুণীর স্বামী যে পরিমাণ টাকা দাবি করেছেন, তা স্বাভাবিকের চেয়ে চার গুণ বেশি এবং সেই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মেয়েটির পরিবার।

গভর্নর পরামর্শ দেন, মেয়েটিকে আলাদা একটি ঘর দেয়া উচিত। তিনি যোগ করেন, কর্মকর্তারা তাঁর স্বামীকে সতর্ক করবে যাতে তিনি আর মারধর না করেন,"অন্যথায় তাকে জেলে যেতে হবে। তবে এই জবাবে সন্তুষ্ট না হয়ে তুবার বাবা পরে বিবিসিকে জানান, পরিবার আদালতের মাধ্যমেই তালাকের আবেদন চালিয়ে যাবে। যদিও তালেবানের আদালত ব্যবস্থায় স্বামীর সম্মতি ছাড়া একজন নারীর পক্ষে তালাক পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

১৯৯০ দশকে তালেবানের প্রথম দফায় ক্ষমতায় থাকার সময় সারহাদি ছিলেন একজন সামরিক কমান্ডার। ২০০১ সালের শেষভাগে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট যখন তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করে, তখন যে হাজার হাজার যোদ্ধা আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি গুয়ান্তানামো বে-তে কয়েক বছর মার্কিন বন্দিশালায় কাটান, তবে একসময় মুক্তি পান।

বামিয়ানে বুদ্ধের একটি মূর্তি ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থান,সারহাদি দাবি করেন যে তিনিই এটি ধ্বংস করেছিলেন ছবি: বিবিসি
তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় এলে তিনি প্রথমে বামিয়ান প্রদেশের এবং জুন মাসের শেষ ভাগে যখন আমাদের সাক্ষাৎ হয়, তখন জোযজান প্রদেশের শেবারঘান শহরের গভর্নর ছিলেন। সম্প্রতি তাঁকে উত্তরের কুন্দুজ প্রদেশের সামরিক কোরের ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

একটি পুরোনো বাটন ফোনে দ্রুত আঙুল চালাতে চালাতে সারহাদি জানান, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সাম্প্রতিক স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে কাজের গতি কিছুটা ধীর হয়ে গেছে। আগে কোনো নথি পাঠিয়ে খুব দ্রুত উত্তর পাওয়া যেত। এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আর কিছু বললে সমস্যা হতে পারে বলে তিনি কথা থামিয়ে দেন।

তবে ২৫ বছর আগের তুলনায় তাঁর চিন্তাভাবনায় খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। সেই সময় তিনি বামিয়ানে সামরিক কমান্ডার ছিলেন, যেখানে তালেবান বাহিনী প্রাচীন ও বিশাল বুদ্ধ মূর্তিগুলো বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল. যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র নিন্দার জন্ম দেয়। প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাটির কথা উঠতেই তিনি প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তবে শেষ পর্যন্ত বলেন, আমি নিজের হাতে ওগুলো ধ্বংস করেছিলাম।

তিনি বলেন, আমরা অতীতে যা করেছি এবং এখনো যা করছি, তা ঈশ্বরের নির্দেশ ও আইন অনুযায়ী করেছি,  আমরা মূর্তি বিক্রি করার চেয়ে ভেঙে ফেলাকেই শ্রেয় মনে করি। কেন আমি অনুশোচনা করব? ওটা ছিল ঈশ্বরের ইচ্ছা।

হাবিবুল্লাহ বদর বলেন যে, অতীতে তিনি আত্মঘাতী হামলার অভিযানের সাথে জড়িত ছিলেন ছবি: সংগৃহীত
রাজধানী কাবুলে আরেকজন জ্যেষ্ঠ তালেবান নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, যিনি সহিংস অতীত ছেড়ে এখন বর্তমান প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। হাবিবুল্লাহ বদর আমাদের একটি সাঁজোয়া গাড়িতে করে কাবুলের রাস্তা দিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন।

তিনি জানান, আগে তিনি কাবুলে আত্মঘাতী হামলাকারীদের অপারেশন পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। বলেন, আমি কাবুলের সব রাস্তা ও গলি খুব ভালো করে চিনি... আমাদের কাছে কাবুলের অলিগলি সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য ছিল। কিছু এলাকার পরিকল্পনার জন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন হতো।

তালেবানের আত্মঘাতী হামলায় আফগানিস্তানে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন নিরীহ সাধারণ নাগরিক। তবে নিজের অতীত নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক বদর। তিনি মনে করেন এগুলো মানুষকে কষ্ট দেবে এবং পুরোনো ক্ষতকে তাজা করবে।

সাধারণ মানুষের মৃত্যুর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, তালেবানের মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন কনভয় এবং সাধারণ মানুষকে বিদেশি ঘাঁটিগুলো থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হতো। বেসামরিক এলাকায় সংঘটিত নির্দিষ্ট হামলাগুলো নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রতিবারই বিষয়টি এড়িয়ে যান।

Taliban Afghanistan 05
শারীরিক চিকিৎসার জন্য তিনি বর্তমানে সরকারি দায়িত্ব থেকে সাময়িক বিরতিতে আছেন। তবে এর আগে তিনি দেশের সব কারাগারের উপ-প্রধান ছিলেন এবং এমন একটি কারাগার পরিচালনা করতেন, যেখানে আগের সরকারের আমলে তিনি নিজেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে বন্দি ছিলেন।

বদর আমাদের একটি উপজাতীয় সমাবেশে আমন্ত্রণ জানান, যেখানে একটি দাতব্য সংস্থার প্রধান তাঁকে পদক দিয়ে ভূষিত করার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়।

সংস্থার প্রধান সুলতান মোহাম্মদ তালাই বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, জনাব বদর আফগানিস্তানের গর্ব এবং একজন মহান যোদ্ধা। তবে আমার একটি অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা যদি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হতো, তবে তা আফগানিস্তানের জন্য এক মহান কাজ হতো। আশা করি এই কথায় আপনারা অসন্তুষ্ট হবেন না।

উপস্থিত সবার মাঝে নেমে আসে এক অস্বস্তিকর নীরবতা। তালাইয়ের হাত থেকে মুহূর্তের মধ্যে মাইক্রোফোন সরিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি বিবিসিকে বলেন, আমি মেয়েদের স্কুল পুনরায় খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলাম... ইসলামে জ্ঞান অর্জন করা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ফরজ।

তিনি আরও যোগ করেন, আমার আরও অনেক কিছু বলার ছিল, কিন্তু তারা আমাকে আর কথা বলতে দেয়নি। তবে যাঁরা সরাসরি তালেবানের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাঁদের প্রায়শই আরও কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়।

আমাদের সঙ্গে আলাপকালে আফগান নারীরা জানান, শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে তাঁদের স্বপ্ন কীভাবে চুরমার হয়ে গেছে। প্রতিবাদের অপরাধে অনেককে কারাবরণও করতে হয়েছে। আমাদের সঙ্গে কথা বলা সাংবাদিকদের সিংহভাগই জানান, তালেবানের গোয়েন্দা সংস্থা ‘এস্তিখবারাত’ তাদের ডেকে পাঠিয়েছে বা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

এসব উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে আমরা তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদের মুখোমুখি হই। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি সরকারের প্রধান মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বহু বছর ধরে ছদ্মনাম ব্যবহার করে আসা এই মুখপাত্র প্রথমবার আমাদের কাছে তাঁর আসল নাম প্রকাশ করেন- তাহির শাহ সিদ্দিকী।

জবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, নারীর অধিকার ও বাকস্বাধীনতার বিষয়টিকে ‘শরিয়াহর দৃষ্টিতে’ দেখা প্রয়োজন ছবি: বিবিসি
আমেরিকানদের অর্থায়নে নির্মিত একটি অত্যাধুনিক সংবাদ সম্মেলন কেন্দ্রে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তালেবান কাবুল দখলের দুই দিন পর তিনি এই কক্ষেই নিজের প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেদিন তিনি বিশ্ববাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তালেবান সরকার নারীদের আমাদের কাঠামোর মধ্যে পড়ালেখা ও কাজ করার সুযোগ দেবে এবং তারা সমাজে খুব সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।

কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হলো না কেন? জবাবে তাহির শাহ সিদ্দিকী বলেন, আমরা শরিয়ার কাঠামোর মধ্যে থেকে নারীদের অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও অন্যান্য বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের সব কিছুকে শরিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখতে হবে।

তাঁর নিজের কার্যালয়ের মতো জায়গাগুলোতে নারীদের কাজ করার সুযোগ দিলে অনৈতিকতা ছড়াবে এবং তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে বলে তিনি দাবি করেন। নারী শিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এখনো বিবেচনাধীন রয়েছে... আমাদের এর একটি শরিয়াহ-সম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

গণমাধ্যমের ওপর তালেবানের বিধিনিষেধ সম্পর্কে তিনি বলেন, আফগানিস্তানের মতো সমাজে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা গণমাধ্যমকে যা খুশি তা প্রচার করার অনুমতি দিতে পারি না... তারা ইসলামিক আইন ও রীতির বিরুদ্ধে কিছু সম্প্রচার করতে পারবে না।

নারীরা জানান, শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে তাঁদের স্বপ্ন কীভাবে চুরমার হয়ে গেছে ছবি: সগৃহীত
তালেবান সরকার কাবুলে অবস্থান করলেও, মুজাহিদ তাঁর অধিকাংশ সময় কাটান দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কান্দাহারে, যাকে তালেবানের প্রাণকেন্দ্র এবং বর্তমানে কার্যত ডি-ফ্যাক্টো রাজধানী মনে করা হয়।

আমরা তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েছিলাম, যিনি কান্দাহারে অবস্থান করেন। তিনি জনসমক্ষে খুব কম আসেন এবং কখনোই কোনো সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেননি। আমাদের জানানো হয়, এই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সম্ভব নয়।

দুই বছর আগে যখন কান্দাহারে এসেছিলাম, তার চেয়ে এখানকার নিয়মকানুন আরও কঠিন করা হয়েছে। এখন পুরুষদের দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রেডিও স্টেশনে গান বাজানো বা নারীদের কণ্ঠ সম্প্রচার নিষিদ্ধ এবং শহরে আমাদের চিত্রগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

ধুলোবালি ছড়ানো রাস্তা ধরে দুই ঘণ্টার দূরত্বে কিছু সাবেক নিবেদিতপ্রাণ তালেবান যোদ্ধা আমাদের তাদের পুরোনো গোপন গুহা ব্যবস্থা ঘুরে দেখান।

আবিদ লালাই নামে এক সাবেক যোদ্ধা, যিনি এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নিরাপত্তাচৌকিতে কর্মরত, তিনি আমাদের সেই ছিদ্রগুলো দেখান যেখান থেকে তিনি গুলি চালাতেন। এছাড়া যেখানে তিনি কুরআন রাখতেন এবং একে-৪৭ ঝুলিয়ে রাখতেন, সেই স্থানগুলোও দেখান।

তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আবদুল সামাদ একটি নামহীন কবরস্থান দেখিয়ে জানান, তাঁর বাবা তালেবানের হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন এবং এখানেই শায়িত আছেন।জাতিসংঘের তথ্য মতে, আফগানিস্তানের চারজনের মধ্যে তিনজন মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারে না। এলাকাটি তেমনি একটি চরম বঞ্চিত অঞ্চল।

পাঁচ বছরে আফগান নারীদের বেশিরভাগ কর্মক্ষেত্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে ছবি: সংগৃহীত
সামাদ বলেন, স্থানীয়দের পানি, রাস্তাঘাট ও চিকিৎসার চরম প্রয়োজন। ইসলামিক এমিরেটের কর্মকর্তারা আমাদের ভুলে যাননি, সামাদ বলেন। তাঁর মতে নেতারা হয়তো অন্য কোনো জরুরি কাজে ব্যস্ত আছেন। আমরা আশাবাদী, তাঁরা কোনো একদিন আমাদের দিকে নজর দেবেন।

তালেবান দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পরও দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। আমাদের সঙ্গে কথা বলা তালেবান নেতারা দাবি করেছেন যে তারা এই সংকট নিরসনে কাজ করছেন, তবে সাধারণ আফগানদের একাংশের মতে, এই তালেবান গোষ্ঠীই আসলে দেশটির প্রধান সমস্যা।

যে গোষ্ঠীটি জীবনের অর্থই বোঝে না, তারা হঠাৎ কীভাবে ক্ষমতায় চলে এল, তা ভেবে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই, বলেন হুদা (আসল নাম নয়), যিনি তালেবান ক্ষমতায় আসার পর রাজপথে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। নারীরা এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না, তিনি বিবিসিকে বলেন। তালেবান হয়তো বিধিনিষেধ বাড়াতেই থাকবে, কিন্তু পরিস্থিতি চিরকাল এমন থাকবে না।

তিনি যোগ করেন, আমার মনে হয় তালেবান শিক্ষিত নারীদের ভয় পায়, সেই কারণেই তারা নারীদের ওপর এত নিষেধাজ্ঞা চাপায়। তারা অশিক্ষিত নারী চায়, যাতে তারা জ্ঞানী সন্তান গড়ে তুলতে না পারে। কারণ তা হলেই তালেবান শাসনের অবসান ঘটবে।