খাদের কিনারে স্টারমার, রাজনৈতিক অস্থিরতায় টালমাটাল ব্রিটেন

স্থানীয় নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় এবং দলের ভেতরে ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহ সত্ত্বেও পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, গত ৪৮ ঘণ্টার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কাটিয়ে তিনি সরকার পরিচালনায় মনোনিবেশ করবেন। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মাথায় স্টারমার এখন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কঠিনতম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

লেবার পার্টির সাম্প্রতিক নির্বাচনী ভরাডুবির পর থেকে স্টারমারের বিদায়ের দাবি জোরালো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৮০ জনেরও বেশি লেবার আইনপ্রণেতা জনসমক্ষেই তাঁর পদত্যাগের সময়সীমা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। বিদ্রোহীদের আশঙ্কা, স্টারমার ক্ষমতায় থাকলে দলের জনপ্রিয়তা আরও তলানিতে ঠেকবে।

Keir Starmer
তবে ১০ ডাউনিং স্ট্রিট থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভাকে বলেছেন, দলের নিয়ম অনুযায়ী নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার যে প্রক্রিয়া রয়েছে, তা এখনো শুরু হয়নি। মন্ত্রিসভার অনেক অনুগত সদস্য তাঁকে সমর্থন দিলেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের মতো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ না খোলায় সংশয় আরও বেড়েছে।

রাজনৈতিক এই অস্থিতিশীলতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ব্রিটেনের অর্থনীতিতেও। প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রিটেনের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেছে। স্টারমার নিজেই স্বীকার করেছেন, এই রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে, যা সাধারণ পরিবারগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বন্ড মার্কেটের বিনিয়োগকারীরা ভয় পাচ্ছেন, স্টারমার বা অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভস অপসারিত হলে তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন বামপন্থী কোনো নেতা, যিনি সরকারি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবেন। বর্তমানে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেনের ঋণ নেয়ার খরচ সবচেয়ে বেশি, যা ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।


ব্রিটিশ রাজনীতিতে লেবার পার্টির প্রধানকে সরানো রক্ষণশীলদের (কনজারভেটিভ) তুলনায় কিছুটা জটিল। স্টারমারকে সরাতে হলে অন্তত ৮১ জন আইনপ্রণেতাকে একজন নির্দিষ্ট প্রার্থীর পেছনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিদ্রোহীদের মধ্যে বামপন্থী এবং মধ্যপন্থীদের ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ থাকায় এখন পর্যন্ত একক কোনো উত্তরসূরি বা চ্যালেঞ্জার উঠে আসেনি।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের নাম সবার আগে থাকলেও ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নাম এবং সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনারও আলোচনায় আছেন। তবে, বার্নামের পার্লামেন্টে আসন না থাকা এবং রেনারের পুরনো কর সংক্রান্ত জটিলতা তাঁদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২০ সালে জেরেমি করবিনের হাত থেকে ধ্বংসপ্রায় লেবার পার্টিকে টেনে তুলেছিলেন কিয়ার স্টারমার। ২০২৪ সালে ‘স্থিতিশীলতা’র প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও আজ সেই স্থিতিশীলতাই উধাও। একদিকে নিজের দলের আইনপ্রণেতাদের অনাস্থা, অন্যদিকে টালমাটাল অর্থনীতি, সব মিলিয়ে কিয়ার স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্ব এখন খাদের কিনারায়। আগামী কয়েক দিন ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।