ভারতের একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাড়ে সাত কোটি ইউরো বা প্রায় এক হাজার কোটি টাকার গোলাবারুদ চুক্তির বড়সড় কেলেঙ্কারিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত ছোট্ট দেশ এস্তোনিয়ায়। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া একটি সংস্থাকে এত বিপুল অঙ্কের সামরিক চুক্তি দেওয়ার অভিযোগের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হ্যানো পেভকুর। এস্তোনিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ইআরআর পুরো ঘটনাটিকে ‘প্রতিরক্ষা ক্রয়ের এক বিশাল কেলেঙ্কারি’ বলে আখ্যা দিয়েছে, যা নিয়ে ইউরোপজুড়ে শোরগোল পড়ে গেছে।
এই বিতর্কিত নাটকের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ডাটাসেল’ নামের ইতালির একটি ছোট্ট প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ভারতের নাগপুরভিত্তিক শিল্পপতি জয়সওয়াল পরিবারের মালিকানাধীন নেকো গ্রুপ তাদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘নেকো ডিফেন্স মিউনিশনস’-এর মাধ্যমে ডাটাসেলকে কিনে নেয়।
আগে ডাটাসেল প্রতিরক্ষা ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে অল্পস্বল্প কাজ করলেও গোলাবারুদ বা আর্টিলারি সেল সরবরাহের কোনো অভিজ্ঞতা তাদের ছিল না। তা সত্ত্বেও মালিকানা পরিবর্তনের কয়েক মাসের মাথায়, অর্থাৎ আগস্টে ১৫ মিলিয়ন ও অক্টোবরে ১০ মিলিয়ন ইউরোর চুক্তি বাগিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরে ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ চুক্তির আকার দাঁড়ায় প্রায় ৭০ মিলিয়ন ইউরোতে।
রহস্যজনকভাবে, মালিকানা হস্তান্তরের আগেই ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ কেন্দ্রের সঙ্গে গোপনীয়তা চুক্তি সই করেছিল ডাটাসেল।
ইউক্রেন সহায়তা ও আন্তর্জাতিক তছরুপ: রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা করার জন্যই মূলত এই গোলাবারুদ কেনার উদ্যোগ নিয়েছিল এস্তোনিয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইউরোপিয়ান পিস ফ্যাসিলিটি’ তহবিল থেকে এই ক্রয়ের বিপুল অর্থ সংস্থান করার কথা ছিল। তবে এস্তোনিয়ার অভিযোগ, ডাটাসেল নির্ধারিত সময়ে গোলাবারুদ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং যেটুকু এসেছে তাও মানসম্মত ছিল না। ফলে চুক্তি বাতিল করে আগাম দেওয়া অর্থ ফেরত দাবি করেছে এস্তোনিয়া সরকার, যা না পেলে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা।
উল্টো তোপ ভারতের কোম্পানির: তবে যাবতীয় দায় এস্তোনিয়ার ওপর চাপিয়ে উল্টো তোপ দেগেছে ডাটাসেল। কোম্পানির দাবি, তারা ইতোমধ্যে ৫৯ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করেছিল এবং এস্তোনিয়া চুক্তি বাতিল না করলে পুরো সরবরাহ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো। এস্তোনিয়ার নেওয়া পদক্ষেপকে সংঘাতপূর্ণ ও অযৌক্তিক দাবি করে ডাটাসেল বলেছে, এই অন্যায় সিদ্ধান্তে তারাই এখন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ।
ধোঁয়াশা ও অডিটের চোখ ফাঁকি: অস্ত্র ব্যবসার কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়া কীভাবে একটি ছোট প্রতিষ্ঠান এমন বিশাল চুক্তি পেল এবং এসব গোলার আসল উৎপাদক কে ছিল—তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নেকো গ্রুপ কি ভারতে এসব তৈরি করতে চেয়েছিল, নাকি অন্য কোথাও থেকে কিনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সরবরাহ করতে চেয়েছিল, তার কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
এদিকে এস্তোনিয়ার জাতীয় হিসাব নিরীক্ষা কার্যালয় বারবার দেখতে চাওয়া সত্ত্বেও তাদের কাছে এই ৭০ মিলিয়ন ইউরোর নথিপত্র গোপন করা হয়েছিল। ইউক্রেনকে সহায়তার নামে এমন সন্দেহজনক কেনাকাটা এবং কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের দায়ে অবশেষে এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে ক্ষমতা ছাড়তে হলো, যা ইউরোপের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া