জার্মানির রাজ্য নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থীদের ঐতিহাসিক জয়

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের সাম্প্রতিক প্রাদেশিক নির্বাচনে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে দেশটির উগ্র ডানপন্থী দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি)। প্রাথমিক ফলাফলে দলটি প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট অর্জন করে প্রথম স্থান ছিনিয়ে নিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে এই প্রথম কোনো ডানপন্থী দল এককভাবে রাজ্য পর্যায়ে ক্ষমতায় পৌঁছানোর এত কাছাকাছি এলো। এই জয়ের মাধ্যমে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ জোট কেবল শোচনীয় পরাজয়ের মুখেই পড়েনি, বরং জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ভারসাম্য চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

German Election 03
এবারের নির্বাচনে স্যাক্সনি-আনহাল্টের প্রায় ৭৭.৮ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, যা রাজ্যটিতে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পরপরই মাগডেবুর্গ শহরে দলের নির্বাচনী কার্যালয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েন সমর্থকেরা।

স্যাক্সনি-আনহাল্টে দলের ৩৫ বছর বয়সী প্রধান প্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ড বিজয়ের পর প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, আমরা এই দেশে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছি। সাধারণ মানুষ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তারা দেশের নীতিগত আমূল পরিবর্তন চায় এবং তারা আমাদের নেতৃত্বেই এই পরিবর্তন দেখতে আগ্রহী।

জিগমুন্ড স্যাক্সনি-আনহাল্টের এই ঐতিহাসিক সাফল্যকে ২০২৯ সালের জার্মানির জাতীয় সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের প্রথম ধাপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশালে ফলটির স্ক্রিনশট শেয়ার করেন এবং ইউরোপের অন্যান্য কট্টরপন্থী নেতারাও এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানান।

German Election 02
এই ফল চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জের জন্য চরম এক রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনৈতিক মন্দা এবং বারবার বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বুথফেরত জরিপে দেখা গেছে, স্যাক্সনি-আনহাল্টের ৮৭ শতাংশ ভোটার কেন্দ্র সরকারের নীতি ও পরিচালনায় চরম অসন্তুষ্ট।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রাদেশিক নির্বাচন বস্তুত বার্লিনের কেন্দ্র সরকারের প্রতি জনগণের একটি অনাস্থা প্রস্তাবের শামিল। তবে এএফডি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তাদের একচ্ছত্র সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জার্মানির মূলধারার সবকটি দল এএফডি’র সঙ্গে যেকোনো ধরনের জোট গঠনের বিষয়টি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা দলটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'উগ্র ডানপন্থী চরমপন্থী' হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

অন্যান্য দলীয় অবস্থান: শুধু নতুন গঠিত জোট ‘সাহরা ওয়াগেনকনেখট অ্যালায়েন্স’ অপ্রথাগত উপায়ে এএফডি’র সমর্থনে কাজ করার অস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিল। তবে জিগমুন্ড সেই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রয়োজনে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, কিন্তু নীতিগত আপস করে কোনো অকার্যকর জোট সরকার তারা গঠন করবেন না।

রাজনীতিতে এই নজিরবিহীন উত্থানের পেছনে এএফডির অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচারণাকে মূল কারণ হিসেবে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বর্তমানে জার্মানিতে এএফডি সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসেবে উঠে এসেছে এবং জরিপে ২৮ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তারা শীর্ষে রয়েছে।

German Election 01
স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে এএফডির প্রধান প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে:

কঠোর অভিবাসন নীতি: অবৈধ অভিবাসনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং মূলধারার স্কুলগুলোতে শরণার্থী শিশুদের জন্য পৃথক ক্লাসের ব্যবস্থা করা।

শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ঐতিহ্য রক্ষা: বিদ্যালয়গুলোতে রেইনবো পতাকা প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা, প্রতিদিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা এবং জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া বাধ্যবাধকতা করা।

শিক্ষা কার্যক্রমে পরিবর্তন: জার্মান ইতিহাসের পাঠ্যক্রমে নাৎসি আমলের অতি-গুরুত্ব কমিয়ে জাতীয় ঐতিহ্যের ওপর আলোকপাত করা এবং রাশিয়ান ভাষার শিক্ষা বৃদ্ধি করা।

বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা নীতি: নতুন কোনো উইন্ড ফার্ম তৈরি বন্ধ রাখা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব ‘সিটিজেন পেট্রোল’ ব্যবস্থা জোরদার করা।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স