বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় ইউরোপ!

ইউরোপের রাজনীতি ও সামরিক অঙ্গনে এখন এক গভীর উদ্বেগের ছায়া। পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী সুওয়ালকি করিডোরের কাছে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র বেলারুশের সাম্প্রতিক বৃহৎ সামরিক মহড়া ন্যাটো জোটের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে দুর্বল ভৌগোলিক স্থানটিতে নতুন করে আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে। এই পটভূমিতে ইউরোপীয় নেতারা সম্ভাব্য রুশ আগ্রাসন ও হাইব্রিড আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অভূতপূর্ব সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

সম্ভাব্য রুশ আগ্রাসন মোকাবিলায় বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের সরকারসমূহ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে গোপন গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের পর দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে সুরক্ষা দিতে বিশেষ পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন।

Vladimir Putin 03
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড ট্রাস্ক সতর্ক বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, রাশিয়া ন্যাটো দেশগুলোতে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তা নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

অন্যদিকে নাগরিকদের জন্য ক্যানড খাদ্য ও পানীয় জল মজুত রেখে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সেনাপ্রধান বর্তমান সময়কে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইউরোপের অন্যতম সামরিক শক্তির দেশ জার্মানি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও হাসপাতালগুলোকে যে কোনো জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্জ ইউরোপ মহাদেশের স্বাধীনতা ও শান্তি রক্ষায় সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

সুইজারল্যান্ড প্রথাগত নিরপেক্ষতার পথ বজায় রাখা সত্ত্বেও নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে দেশটি, যেখানে যেকোনো সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধে স্বাবলম্বী হওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পোল্যান্ডে একটি স্থায়ী মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অগ্রগতির কথা জানান এবং এর আগে সিআইএ পরিচালককে গোপন অভিযানে মস্কোয় পাঠিয়ে ন্যাটো ভূখণ্ডে হামলা না চালাতে সতর্কবার্তা দেন।

Europe in War 02
সুওয়ালকি করিডোর কেন্দ্রিক ঝুঁকি:
যুক্তরাষ্ট্রের আদালত সম্প্রতি রুশ গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে বিশ্বজুড়ে এবং ইউরোপে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে পাঁচজনকে অভিযুক্ত করেছে। ইউরোপিয়ান দেশগুলো বহুদিন ধরেই এ ধরনের সাইবার আক্রমণ, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও ড্রোনের মাধ্যমে পরিকাঠামো অস্থিতিশীল করার মতো অপতৎপরতার মুখোমুখি হচ্ছে। সরাসরি প্রথাগত যুদ্ধ ঘোষণা না করে এসব কৌশল বাস্তবায়ন করাকে বলা হয় 'গ্রে জোন' অপতৎপরতা।

পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যকার ৬৫ মাইল দীর্ঘ সুওয়ালকি করিডোরটি বাল্টিক দেশগুলোকে (লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া) ন্যাটোর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া বা বেলারুশ যদি এই অঞ্চলটির সামান্য অংশও দখল করে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ার ওপর পুরো ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো কোনো ছোট ভূখণ্ডের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকিতে যাবে কি না, এই অনিশ্চয়তা তৈরি করাই পুতিনের মূল উদ্দেশ্য। ন্যাটো মহাসচিব এ ধরনের পদক্ষেপে কঠোর জবাব দেয়ার কথা বললেও, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন সেটিকে জটিল করে তুলেছে।

Europe in War 04
ইউক্রেন থেকে অর্জিত শিক্ষা ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান:
ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে শিখিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু সামরিক অস্ত্রই যথেষ্ট নয়; বরং বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র, হাসপাতাল, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখাই প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত। ইউক্রেনের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ন্যাটো সংকটকালে জাতীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো, শুধু আক্রমণের জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়ে নয়, বরং সমাজকে সব দিক থেকে শক্তিশালী করে পুতিনকে দেখানো যে আগ্রাসন চালিয়ে কোনো লাভ হবে না।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভূমিকার ওপর অতি-নির্ভরশীলতা নিয়ে ইউরোপে শঙ্কা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও বিস্তৃত থাকায় ইউরোপে মার্কিন নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন অনুধাবন করছে যে, কোল্ড ওয়ারের পরবর্তী শান্তিকালীন সময় শেষ এবং এখন পুতিনের আগ্রাসনের কৌশল ব্যর্থ করতে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিজেদেরই মজবুত করতে হবে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন