ভারতের দীর্ঘদিনের দাবির পথ ধরে এবার জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) আমূল সংস্কার এবং পাঁচ স্থায়ী সদস্যের বিতর্কিত ‘ভিটো’ ক্ষমতা পুরোপুরি বাতিলের জোরালো দাবি জানিয়েছে তুরস্ক।
ব্লুমবার্গে প্রকাশিত ‘দ্য ইউএন শুড অ্যাবোলিশ দ্য সিকিউরিটি কাউন্সিল ভিটো’ শীর্ষক এক নিবন্ধে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, বিশ্ব শুধু পাঁচটি পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণে চলতে পারে না। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর, ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক করতে নিরাপত্তা পরিষদের খোলনলচে বদলে ফেলা এখন সময়ের দাবি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে গঠিত এই সংস্থায় চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র- এই পাঁচ স্থায়ী সদস্য একচ্ছত্র ভিটো ক্ষমতার মাধ্যমে পুরো বিশ্বের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব বজায় রেখে আসছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ বেমানান।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট নিবন্ধে উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পুরনো কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, যা আধুনিক যুগের চাহিদাকে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ। মহামারি, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মতো সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটগুলো প্রমাণ করেছে যে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দেশের হাতে পৃথিবীর ভাগ্য ছেড়ে দেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
ভারতের মতো বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো যখন দীর্ঘদিন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের দাবি জানিয়ে আসছে, তখন এরদোয়ান একটু ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। তিনি যুক্তি দেন, শুধু নতুন কিছু দেশকে স্থায়ী সদস্য করে ভিটো ক্ষমতার সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো সমস্যার আসল সমাধান নয়; বরং প্রকৃত বৈশ্বিক সুবিচারের জন্য মূল কৌশলগত লক্ষ্য হতে হবে ‘ভিটো’ ব্যবস্থার অবসান ঘটানো।
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী কাঠামো ভেঙে দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে (ইউএনজিএ) মূল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আনার আহ্বান জানিয়েছেন এরদোয়ান। তাঁর প্রস্তাবিত নতুন মডেলে নিরাপত্তা পরিষদে কোনো স্থায়ী সদস্য থাকবে না; বরং সাধারণ পরিষদের সব সদস্য দেশের ভোটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হবে।
পুনরায় নির্বাচিত হতে হলে যে কোনো দেশকে সাধারণ পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থা অর্জন করতে হবে। এর মাধ্যমে সাধারণ পরিষদের কাছে নিরাপত্তা পরিষদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং কোনো একক রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতকে একতরফাভাবে আটকে দেওয়ার ক্ষমতা পাবে না।
এরদোয়ান জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে এশিয়ার উদীয়মান ভূমিকা, আফ্রিকার বিপুল সম্ভাবনা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকারকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিগত ২৫ বছরের বৈশ্বিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তন প্রমাণ করেছে যে কোনো একক ক্ষমতা ভারসাম্য স্থায়ী নয়।
বর্তমান গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সমতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে পারেনি। এ অবস্থায় বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ব্লক তৈরির পরিবর্তে বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ও টেকসই শান্তির স্বার্থে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে এক ছাতার নিচে আনার বার্তা দিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তুরস্ক বহুপক্ষীয় কূটনীতির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনে এবং এক "অধিকতর ন্যায্য পৃথিবী" গড়তে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি