রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্মদিন উপলক্ষে এক নারকীয় ও বর্বরোচিত হামলা চালালো রুশ বাহিনী। ইউক্রেনজুড়ে রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র ও শক্তিশালী ড্রোনের ভয়াবহ ঢেউ ছড়েছে মস্কো, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম হামলা বলে অভিহিত করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এই হামলায় অন্তত ২৪ জন নিরীহ নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছে অবোধ শিশুরাও। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে শিল্প প্রতিষ্ঠান, বহুতল ভবন এবং জ্বালানি অবকাঠামো।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাটি ঘটেছে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ প্রদেশের প্রিলুকি শহরে। সেখানে রাশিয়ার ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবন তাসের ঘরের মতো পুরোপুরি গুঁড়িয়ে গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, শুধুমাত্র প্রিলুকি শহরের সেই ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকেই চার শিশুসহ অন্তত ১৮টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এছাড়া আহত হয়েছেন প্রায় ৫৫ জন নাগরিক। প্রিলুকির উপ-মেয়ার ডানিলো সাভেঙ্কো জানিয়েছেন, শহরের কেন্দ্রস্থলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে এখনো আটকে পড়াদের সন্ধানে ক্রেন, এক্সক্যাভেটর ও বেলচা হাতে উদ্ধারে নেমেছেন ডজন ডজন উদ্ধারকারী দল।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই নৃশংসতার প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পুতিনের জন্মদিনের 'উপহার' হিসেবেই রাশিয়ান সেনাবাহিনী এই নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। প্রিলুকির বাইরে কিয়েভ, ওলেকসান্দ্রিয়া এবং ক্রেমেনচুকে আরও অন্তত ৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
মোট ৭০টি উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ডজন ডজন শাহেদ ড্রোন দিয়ে রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর এই পৈশাচিক আঘাত হেনেছে। তিনি আরও বলেন, রুশরা মানুষকে কষ্ট দিতে এবং জঘন্যভাবে শক্তি প্রদর্শন করতেই এই আঘাত হেনেছে।
অবশ্য রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই হামলার সত্যতা স্বীকার করে দাবি করেছে, তারা কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইউক্রেনের সামরিক-শিল্প অবকাঠামো লক্ষ্য করে উচ্চমানের সূক্ষ্ম অস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে এই ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা সংস্থা ফায়ার পয়েন্টের যেসব কারখানায় ‘ফ্ল্যামিঙ্গো’ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন তৈরি হয়, সেসব লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করেছে মস্কো।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে তারা এবার রাশিয়ার উচ্চগতির অন্তত ৮০ শতাংশ ড্রোন আকাশে থাকতেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে, যা গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় অনেক বেশি সাফল্য।
রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলেনস্কি জানান, আমেরিকার তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই কেবল এই ব্যালিস্টিক হামলা রুখে দিতে পারে, কিন্তু বিশ্বজুড়ে বিশ্বব্যাপী সরবরাহের ঘাটতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার কারণে ইউক্রেন চাহিদা অনুযায়ী এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাচ্ছে না। এর মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ১.২ বিলিয়ন ইউরোর একটি সহায়তা তহবিল পেয়েছে ইউক্রেন, যা পুরোটাই প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোরেটস্কি।
এদিকে, রাশিয়ার অব্যাহত হামলার জবাবে চুপ করে বসে নেই ইউক্রেনও। গত ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার ভেতরে পার্ম, সামারা ও আস্ট্রাখান অঞ্চলে দুটি তেল শোধনাগার এবং একটি সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ মোট চারটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হেনেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী।
কিয়েভ জানিয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার জবাবে রাশিয়ার জ্বালানি খাতে তারা আঘাত অব্যাহত রাখবে। রাতভর বিমান হামলার শঙ্কায় কিয়েভের সাধারণ মানুষ মেট্রো স্টেশনগুলোর মাটির গভীরে আশ্রয় নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত রাত কাটিয়েছেন। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত আর ড্রোনের বিকট শব্দে থমথমে পুরো ইউক্রেনজুড়ে এখন শোক আর প্রতিরোধের আগুন জ্বলছে।