শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষক সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলন এখন নজিরবিহীন গণ-উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে। গত এক মাসের মধ্যে দেশের বৃহত্তম এই গণআন্দোলনের পর রোববার ধ্বংসস্তূপ ও বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে পুরো ফ্রান্স। রাজধানী প্যারিসের প্রাণকেন্দ্র ‘প্লেস দ্য লা রিপাবলিক’-এ ধ্বংসপ্রাপ্ত দোকানপাট, ভাঙা কাচ আর পোড়া ভবনের কঙ্কাল দেখে গভীর ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সাধারণ বাসিন্দারা।
৭১ বছর ধরে প্যারিসে বাস করা রাবাহ নামের এক প্রবীণ নাগরিক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরাও একসময় আন্দোলন করেছি, কিন্তু তা ছিল শান্তিপূর্ণ। পোড়া এক পত্রিকার স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ৫৬ বছর বয়সী ক্লেয়ার আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, প্যারিসকে এতটা বিধ্বস্ত দেখতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এমনকি ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতীক ‘মারিয়ান’-এর মূর্তিতেও দেখা গেছে প্রতিবাদী গ্রাফিতি, যেখানে লেখা- যারা কষ্ট বোনে, তারা ক্ষোভের ফসল কাটে।
মূলত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে শ্রেণীকক্ষে অতিরিক্ত ভিড়, শিক্ষক সংকট ও সুযোগের অভাবের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভের সূচনা হয়। তবে খুব দ্রুত তা সাধারণ মানুষের ক্ষোভের সঙ্গে মিশে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। কর্তৃপক্ষের মতে, শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন; যদিও আয়োজকদের দাবি এই সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ।
তবে বিশাল এই আন্দোলনের পেছনের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো মূল সহিংস ঘটনার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক আন্দোলনকারী। প্যারিসে মিছিল শুরুর আগেই পুলিশের টিয়ারগ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী স্টেফানি জানান, আমাদের মার্চটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু সহিংসতার মাত্রা এত বড় করে দেখানো হচ্ছে, আমাদের প্রকৃত ক্ষোভের কারণগুলো পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানিয়েছেন, উদ্ভূত সহিংসতায় এ পর্যন্ত প্রায় ১,৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার অর্ধেকই প্যারিস থেকে। এছাড়া সংঘর্ষে ৫০০ জনেরও বেশি পুলিশ, জেন্ডারমেস ও দমকলকর্মী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জাতির উদ্দেশে বিশেষ ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
প্যারিস ছাড়াও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইতে ব্যাপক লুটপাট চলেছে এবং নগর ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। লিমোগেস শহরের ঐতিহাসিক সিটি হল ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বর্দো সহ অন্যান্য শহরেও সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মার্সেইয়ের মেয়র বেনোয়েট পায়ান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি কেউ শুনছে না, কারণ কিছু দুর্বৃত্ত সব ধ্বংস করে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, আন্দোলন দমনে পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র সমালোচনা করেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ৩৬টি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে। মানবাধিকার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, সংঘাতের কারণে এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, একজনের চোয়াল ভেঙে গেছে এবং অন্য একজন এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। প্যারিস ইয়ং লয়ার্স ইউনিয়নের সভাপতি ক্রিস্তফ কালভাও বলেন, ভিড় নিয়ন্ত্রণে যে কঠোর পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা জনগণের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর মেয়াদ শেষ হতে এক বছর বাকি থাকলেও, বাজেট ঘাটতি কমাতে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকোর্নুর নেওয়া ব্যয়সংকোচন ও করনীতির পরিকল্পনা জনক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে তুমুল কাদা ছোড়াছুড়ি। বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলেনশঁ সরকারকে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগ তোলেন। পাল্টা জবাবে প্রধানমন্ত্রী লেকোর্নু চরমপন্থী দলগুলোকে এই সহিংসতার ইন্ধনদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা-রয়টার্স