ফ্রান্সে স্থানীয় কারফিউ জারি, জরুরি অবস্থার আশঙ্কা

জীবনযাত্রার চরম ব্যয়বৃদ্ধি ও আয়ের তুলনায় নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে পুরো ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র গণবিক্ষোভ ও নজিরবিহীন লুটপাটের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কিছু অঞ্চলে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারির নির্দেশ দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার।

দেশব্যাপী তীব্র নৈরাজ্য ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর চরম ব্যর্থতার মুখে সোমবার এ নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাত্র ছয় মাস আগে অর্থনৈতিক সংকট ও সরকারের দুর্বলতার সুযোগে ঘটা এই সহিংসতায় থমকে গেছে পুরো দেশ।

France Protest 05
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান ল্যকরনু সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, দেশে আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে তাঁর সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তিনি এখনই পুরো দেশে একযোগে জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক ও আংশিক সান্ধ্য আইন প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন। তবে রাজধানী প্যারিসে ঢালাও কারফিউ জারির সম্ভাবনা তিনি খারিজ করে দেন।

এই সহিংসতা ও তাণ্ডবের পেছনে অতি-বামপন্থী গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন প্রধানমন্ত্রী। যদিও সাবেক অতি-বামপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলঁশোঁ তাঁর এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে প্রমান দাবি করেছেন এবং অযথা উসকানি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

France Protest 03
গত সপ্তাহের শেষভাগে শুরু হওয়া এই ছাত্র ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়। প্রায় তিন হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে বলে ফ্রেঞ্চ রিটেইল ফেডারেশন জানিয়েছে। বিলাসবহুল ব্র্যান্ড যেমন ডিয়োর, রোলেক্স, লুই ভিটন, গুচি এবং ওলাঁম্পিক মার্সেই ফুটবল ক্লাবের অফিশিয়াল আউটলেটগুলোতে পর্যন্ত ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়।

শনিবারের সহিংসতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এক আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ২,৪০০ জনকে এবং বিক্ষোভকারীদের সাথে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন প্রায় ১,০০০ পুলিশ সদস্য।

France Protest 01
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় ফ্রান্সে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। প্যারিস, মার্সেই এবং লিওঁর মেয়ররা যৌথভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কোনো ধরনের নিরাপত্তা ছাড়াই তাঁদের শহরগুলোকে যেন তছনছ হতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ তাঁর পদে ব্যর্থতার দায়ে প্রেসিডেন্টের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলেও প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। মাক্রোঁ তাঁকে পদত্যাগের বদলে দ্রুত ব্যারিকেড ও লুটপাট বন্ধ করার এবং গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

France Protest 03
বর্তমানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে ফ্রান্সের অর্থনীতিতে। সোমবার দেশটির শেয়ারবাজার ১.৩ শতাংশ পড়ে গেছে এবং সরকারি বন্ডের ওপর তৈরি হয়েছে নেতিবাচক প্রভাব। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়ের ক্ষোভ কমাতে এবং জ্বালানির দাম কমাতে প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ বর্তমানে অতিরিক্ত পেট্রোল ও ডিজেল সরবরাহের নিশ্চয়তা পেতে কুয়েত সফরে রয়েছেন।

সহিংসতা ছড়ালেও প্রশাসন জানিয়েছে, প্যারিস সেন্ট জার্মেইন (পিএসজি) ও বার্সেলোনার মঙ্গলবারের গুরুত্বপূর্ণ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচটি নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউরোপের বেশ কিছু দেশ তাদের নাগরিকদের ফ্রান্সে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যেই আগামী ৫ নভেম্বর থেকে ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়নগুলো নতুন করে ধর্মঘট ও গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে, যা বর্তমান সরকারের ওপর সংকট আরও ঘনীভূত করতে পারে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স