স্পেনে ট্রেন ট্রাজেডি: নিহত বেড়ে ৬৮, আরও বাড়ার আশঙ্কা

স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া ও রাজধানী মাদ্রিদের সংযোগকারী হাই-স্পিড রেললাইনে এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা একটি যাত্রীবাহী ট্রেনকে অপর একটি উচ্চগতির ট্রেন পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিলে এই ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে।

এতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে বলে আশঙ্কা করছে উদ্ধারকারি দল। তাদের ধারণা, ধ্বংসস্তুপের নিচের আরও মানুষ আটকে থাকতে পারে। ভয়াবহ এই ঘটনার পর মাদ্রিদ ও দক্ষিণ স্পেনের মধ্যকার সমস্ত রেল পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

স্পেনের কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৯টার কিছু পর টলেডো এলাকার কাছে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

Spain train crash 05
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চার আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পেজ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা ‘রেনফে’-র ট্রেনে অন্তত ২৪ জন এবং বেসরকারী সংস্থা ‘আইরিও’-র ট্রেনে ৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। উদ্ধারকারীরা এখনও দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বগিগুলোর ভেতরে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রবেশ করতে পারেননি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে সতর্ক করেন, দুর্ভাগ্যবশত, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এটিই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

আহতদের মধ্যে প্রায় ৩০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, ৫০ জন বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

Spain train crash 04
যেভাবে দুই হাইস্পিড ট্রেনের সংঘর্ষ:
ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সিগন্যাল বিভ্রাটের কারণে রেল অবকাঠামো ম্যানেজার ‘এডিআইএফ’-এর নির্দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আইরিওর এক্সপ্রেস ট্রেনটি লাইনের ওপর থেমে ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই রাষ্ট্রীয় সংস্থা রেনফের এভিই হাই-স্পিড ট্রেনটি দ্রুতগতিতে এসে দাঁড়িয়ে থাকা আইরিও ট্রেনটির পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়।

দুর্ঘটনাস্থলে এখন উদ্ধারকারী ও জরুরি সেবার শত শত কর্মী কাজ করছেন। আকাশে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের চক্কর, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি মরদেহ বহনের জন্য একাধিক শববাহী গাড়ির আনাগোনা এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ তৈরি করেছে।

Spain train crash 01
আইরিও ট্রেনে থাকা ফিলিপাইন থেকে আসা পর্যটক ফ্রেডেরিক বারিলিয়া সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমরা পুরো স্তব্ধ হয়ে গেছি। ধাক্কা লাগার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হচ্ছিল যেন আমি সিট থেকে উড়ে যাচ্ছি। ভাগ্যক্রমে ট্রেনের দরজাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাওয়ায় তারা অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পেরেছেন।

অন্য দিকে, দুর্ঘটনাস্থলে নিজের স্বজনকে খুঁজতে আসা মানুষের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। মাদ্রিদ থেকে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে আসা অ্যানা নামের এক নারী কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়েই আমি ছুটে এসেছি। আমার স্বামী সেভিলগামী রেনফে ট্রেনের ৮ নম্বর বগিতে ছিলেন... অ্যানার এই আকুতি স্পেনের সাধারণ মানুষের ওপর পড়া এই ট্র্যাজেডির এক করুণ ছবি ফুটিয়ে তোলে।

Spain train crash 02
৯ মাসের মাথায় দ্বিতীয় বড় বিপর্যয়:
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের জন্য অত্যন্ত রাজনৈতিক স্পর্শকাতর মুহূর্তে ঘটল। আগামী ২৯ নভেম্বর স্পেনে আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তার আগেই এমন ঘটনা সারা দেশে বড় ধরনের নাড়া দিয়েছে।

উল্লেখ্য, ঠিক ৯ মাস আগে গত জানুয়ারিতেও এই একই লাইনে এবং একই দুই অপারেটরের দুটি হাই-স্পিড ট্রেনের মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘর্ষে ৪৬ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। কর্ডোবা প্রদেশের আদামুজ এলাকার কাছে হওয়া সেই দুর্ঘটনার স্মৃতি কাটতে না কাটতেই এই নতুন ট্র্যাজেডি স্পেনের ট্রেন অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন একে দিল।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স