ইরানের বিপ্লব বার্ষিকীতে আমেরিকা-ইসরাইলবিরোধী হুংকার

ইসলামি বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় সমাবেশগুলোতে ইরান আবারও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলসহ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তাদের সুর কঠোর করেছে। দেশব্যাপী নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভের মাত্র এক মাস পর এবং গত জুনের যুদ্ধের আবহে আয়োজিত এই সমাবেশগুলো মূলত তেহরানের শক্তি প্রদর্শন এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ দমনের একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের স্মৃতি স্মরণে বুধবার ইরানজুড়ে আয়োজিত হয়েছে বিশাল রাষ্ট্রীয় সমাবেশ। তবে এবারের প্রেক্ষাপটটি বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেকটাই আলাদা। গত জুনে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ডিসেম্বরের শেষভাগ থেকে চলা দেশব্যাপী আন্দোলনের ক্ষত এখনও দগদগে।

ছবি: সংগৃহীত
এমন পরিস্থিতিতে বিপ্লব বার্ষিকীকে ইরান বেছে নিয়েছে বাইরের শত্রুদের প্রতি চরম হুঁশিয়ারি দেয়ার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে। তেহরানের বিপ্লব স্কয়ারের কাছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পাঁচ কমান্ডারের প্রতীকী কফিন প্রদর্শন করেছে কর্তৃপক্ষ। এসব কফিনের ওপর মার্কিন পতাকা আঁকা ছিল এবং তাতে সেন্ট্রাল কমান্ড প্রধান ব্র্যাড কুপার ও চিফ অব স্টাফ র‍্যান্ডি অ্যালান জর্জের নাম ও ছবি দেখা গেছে।

পাশাপাশি প্রদর্শিত হয়েছে দীর্ঘ পাল্লার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল এবং গত বছরের যুদ্ধে ভূপাতিত করা ইসরাইলি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ। সমাবেশের আকাশ প্রকম্পিত ছিল ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ এবং ‘ইসরাইল নিপাত যাক’ স্লোগানে। আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট ফারস নিউজ এজেন্সি একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে যেখানে ‘শয়তানের প্রতীক’ হিসেবে মার্কিনী ও ইসরাইলি পতাকার ওপর আসীন এক শিংওয়ালা মানবের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা ছিল ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অনুপস্থিতি। গত ৩৬ বছরের শাসনামলে এবারই প্রথম তিনি সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর বার্ষিক বৈঠকে যোগ দেননি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে গুপ্তহত্যার হুমকির মুখেই তিনি জনসমক্ষে আসা এড়িয়ে চলছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এক ভিডিও বার্তায় তিনি ইরানিদের শত্রুদের হতাশ করে এই বার্ষিকীতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

ছবি: সংগৃহীত
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তেহরানের আজাদি স্কয়ারে দেওয়া বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র রুখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তবে তিনি কৌশলে এও জানিয়েছেন, তার সরকার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় ইচ্ছুক।

কিন্তু রাজপথের এই ‘উৎসবের’ পেছনে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক স্পষ্ট। মঙ্গলবার রাতে মিলাদ টাওয়ারের চারপাশে যখন আতশবাজি ফোটানো হচ্ছিল, অনেক বাসিন্দা ভেবেছিলেন আবার বুঝি যুদ্ধ শুরু হলো। গত জুনের যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি ইরানিদের মনে এখনও সতেজ।

সরকার সমর্থকদের যখন রাজপথে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তুলতে দেখা গেছে, তখন তার পাল্টায় অনেক বাসা-বাড়ি থেকে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগানও শোনা গেছে। মূলত ডিসেম্বরের বিক্ষোভের পর ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভাজন এখন চরমে।

ছবি: সংগৃহীত
বিপ্লব বার্ষিকী উদযাপনের মাঝেই গত মাসের বিক্ষোভের ভয়াবহতা বারবার সামনে আসছে। ইরান সরকার দাবি করেছে যে, ৩,১১৭ জন ‘সন্ত্রাসি’ ও ‘দাঙ্গাবাজদের’ হাতে নিহত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতিসংঘ এবং হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির মতে, নিহতের সংখ্যা সাত থেকে ২০ হাজারের মধ্যে হতে পারে, যার দায় মূলত সরকারি বাহিনীর ওপরই বর্তায়।

 
ইরান বর্তমানে এক কঠিন ত্রিভুজ সংকটের মধ্যে রয়েছে; বাইরে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের হুমকি, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ এবং ভেতরে জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ। বিপ্লব বার্ষিকীর এই শক্তি প্রদর্শন সেই সংকট কতটা কমাতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।